ইতিহাসের ধ্রুবতারা শরীফ ওসমান হাদীর শাহাদাত

ইতিহাসের ধ্রুবতারা শরীফ ওসমান হাদীর শাহাদাত

রাজপথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতেন যে কণ্ঠ, অবিচারের সামনে মাথা নত না করা যে মানুষ—সেই শরীফ ওসমান বিন হাদি (ওসমান হাদি) আর নেই। ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনে সশস্ত্র হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত এই তরুণ সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মী ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তার এই মৃত্যু নিছক মৃত্যু নয়—বরং একটি শাহাদাত।

নামাজ শেষে রক্তাক্ত রাজপথ

প্রথম আলো, কালবেলা ও নয়া দিগন্তে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ১২ ডিসেম্বর দুপুরে জুমআর নামাজ পড়ে পল্টনের বিজয়নগর কালভার্ট রোড এলাকায় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে যাওয়ার সময় হেলমেট পরা মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিটি সরাসরি তার মাথায় লাগে। মুহূর্তেই রক্তে ভিজে যায় রাজপথ। প্রত্যক্ষদর্শীরা ছুটে এলেও ততক্ষণে তিনি মারাত্মকভাবে আহত।

জীবনের সঙ্গে লড়াই

তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে স্থানান্তর করা হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও ঝুঁকি কাটেনি। শেষ আশার জায়গা হিসেবে তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। কিন্তু মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান।

কে ছিলেন শরীফ ওসমান হাদী?

শরীফ ওসমান হাদী ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র। অন্যায়, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী ও আপসহীন। তরুণদের মাঝে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও আলোচনায় ছিলেন।

বন্ধু-সহকর্মীদের ভাষায়, হাদী ছিলেন এমন একজন মানুষ—যিনি ভয়কে জয় করেই কথা বলতেন। তার কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদ, আর চোখে ছিল পরিবর্তনের স্বপ্ন।

শোক, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ

তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ গভীর শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নয়া দিগন্ত ও প্রথম আলো জানায়, অনেকেই এই হত্যাকাণ্ডকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন এবং দোষীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন এবং এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আশ্বাস দেন।

অপেক্ষা ন্যায়বিচারের

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, এটি একটি পরিকল্পিত হামলা হতে পারে—এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। কিছু অগ্রগতি হলেও নিহতের পরিবার, সহযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ এখনো অপেক্ষায়—কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে, এবং কবে হবে ন্যায়বিচার।

শেষ কথা

শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানি নয়। এটি একটি সাহসী কণ্ঠের নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া। যে তরুণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তার রক্ত আজ প্রশ্ন রেখে গেছে—এই দেশে সত্য বলার মূল্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে?

তার স্মৃতি অনেকের মনে থাকবে একজন প্রতিবাদী, আপসহীন এবং স্বপ্নবাজ মানুষ হিসেবে। ইতিহাস হয়তো তাকে মনে রাখবে—একজন শহীদ কণ্ঠ হিসেবে।

Leave a Comment

Scroll to Top