সিসির জন্য হুমকি সাবেক সেনা কর্মকর্তারা

তাঁরা সংখ্যায় কম, কিন্তু কড়ামাত্রায় বিপজ্জনক। মিসরের সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের কথা বলা হচ্ছে। ইসলামপন্থী জঙ্গিদের সঙ্গ ধরেছেন তাঁরা। এতে জঙ্গি দমনে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির অভিযান ক্রমে জটিল হয়ে পড়ছে। এই জঙ্গিদের সিসি এরই মধ্যে অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি বলে ঘোষণা করেছেন।
এসব সেনা কর্মকর্তা জঙ্গিদের সহিংস কর্মকাণ্ডে আগুনে ঘি ঢালার কাজ করছেন। ২০১৩ সালে মিসরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ইসলামপন্থী মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে এ পর্যন্ত জঙ্গিদের বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডে কয়েক শ সেনা ও পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। ২০১১ সালে হোসনি মোবারককে পদচ্যুত করার পর এই জঙ্গি বাহিনী সিনাই উপত্যকায় শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করে।
সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাদের রয়েছে আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা। তাঁরা জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর আত্মঘাতী হামলা চালাচ্ছেন।
স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ এট জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক খলিল আল-আনানি বলেন, মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে কিছু সেনা কর্মকর্তা ইসলামপন্থী গ্রুপ আনসার বায়াত আল-মাকদিসে (এবিএম) যোগ দেন। তাঁরা সেনাবাহিনী ও সরকারি লোকজনের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেন ও হামলা চালান। বিশেষ করে সিনাই উপত্যকায়।

সেনা কর্মকর্তা আববুদ আল-জোমুর ও খালেদ আল-ইসলামবৌলির নেতৃত্বাধীন জঙ্গি বাহিনীর একটি সেল ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে হত্যা করে। এর কয়েক বছর পরে সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাইফ আল-আদেল আল-কায়েদার শীর্ষ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।

মিসরের সেনাবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘সেনাসদস্য যাঁরা বিপথে যাওয়ার ধ্যানধারণা পোষণ করেন, তাঁদের পর্যবেক্ষণে রাখাটা যৌক্তিক ও স্বাভাবিক। যেকোনো সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি সদস্যদের অবশ্যই আনুগত্য থাকতে হবে। কারও বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হলে আমরা তা নেই। সেনাবাহিনী ত্যাগ করা সদস্যসংখ্যা খুব কম। হাতে গোনা যায়।’

মিসরের সেনাবাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট রয়েছে। এই ইউনিট বাহিনীর মধ্যে কেউ মৌলবাদী মতাদর্শ পোষণ করছে কি না, তা খুঁজে বের করে। সূত্র জানায়, তবে এ ধরনের সদস্যের সংখ্যা খুবই কম। ২০০০ জনের মধ্যে হয়তো দুই-তিনজন হবেন। এবিএমে যোগ দেওয়া কয়েকজন সেনাসদস্য ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২০০ জনের বিচার চলছে।

সামরিক বিশেষ বাহিনীর কর্মকর্তা হিশাম আশমাউই এক উদাহরণ যিনি সেনাসদস্য থেকে জিহাদিতে পরিণত হন। সামরিক বাহিনীর অনুগত কর্মী আশমাউইকে ১৯৯৬ সালে থানডারবোল্ট নামের এলিট বিশেষ বাহিনীতে নেওয়া হয়। তিনি রাজনীতি নিয়ে খুবই কম বলতেন ও বাইরে সবার সঙ্গে কদাচিৎ নামাজ পড়তেন। একদিন তিনি কোরআন শরিফ পাঠের সময় স্থানীয় ইমামকে তাঁর ভুল ধরিয়ে দেন। এটি ছিল সেনাবাহিনীর জন্য একটি সূত্র।

আশমাউইর মতো সাবেক সেনা কর্মকর্তা যাঁরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁরা মিসরের জন্য বিশেষ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আশমাউই যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, তাঁর নিচেই মসজিদ। মসজিদের ইমাম শেখ হামদি বলেন, তাঁকে দেখে মনে হতো সেনাবাহিনীতে তিনি তাঁর কাজের প্রতি পুরোপুরি নিবেদিত।

এবিএমের সদস্যদের বিরুদ্ধে তথ্য প্রমাণ জোগাড় করে থাকে জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনী। এই বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, প্রথমে আশমাউইকে প্রশাসনিক পদে বদলি করা হয়। পরে অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং তাঁদের সেনাবাহিনীর নির্দেশ অমান্য করতে উৎসাহী করতে দেখা যাওয়ার আশমাউইকে সামরিক বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। ২০০৭ সালে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর কাছে জিহাদি বইও পাওয়া যায়। চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর তিনি আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা করলেও জিহাদি মনোভাব তাঁর মনে সব সময় ছিল।

আশমাউই তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের নিচের মসজিদে অন্যান্য সাবেক সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতেন। সেখানে তিনি এবিএমের একটি বিশেষ সেল গঠন করেন। এই সেলটি হত্যার কৌশল শেখাত। আরেক সাবেক সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে আশমাউই গ্রুপটির সামরিক প্রশিক্ষণ কমিটির নেতৃত্ব দেন।

জাতীয় নিরাপত্তা তদন্তর সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, এই সেলটি ইসলামি জঙ্গি গ্রুপটির সবচেয়ে বিপজ্জনক সন্ত্রাসী হাতিয়ার। এই সেলটি সিনাই উপত্যকার সবচেয়ে বড় শহর আল-আরিশে হামলার পরিকল্পনাকারী ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত অক্টোবরের ওই হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৩ জন সদস্য নিহত হন।

আশমাউইয়ের মতো আরেকজন ওয়ালিদ বদর। সামরিক অ্যাকাডেমির স্নাতক বদরকে কট্টরপন্থী ইসলামি মনোভাবের জন্য তিনবার সামরিক বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। অবশেষ ২০০৫ সালে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়।

বদরের ছোট ভাই আহমেদ জানান, এরপর বদর সৌদি আরব চলে যান। ২০১২ সালে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইসলামপন্থী মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বদর দেশে ফিরে আসেন। তিনি মনে করেন, মুরসির বিজয় ছিল মিসরকে ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রথম ধাপ।

এক বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৩ সালের ৩ জুলাই ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মুখে তখনকার সেনাপ্রধান ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির নেতৃত্বে উৎখাত হন মুরসি। এরপর মুরসির সমর্থকদের বিরুদ্ধে সরকারের ব্যাপক দমন অভিযান শুরু হয়। এতে অন্তত এক হাজার ৪০০ জন নিহত ও হাজারো মানুষ কারাবন্দী হয়। এ পর্যন্ত দ্রুত বিচারে মুসলিম ব্রাদারহুডের শতাধিক নেতা-কর্মীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। জাতিসংঘ একে সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন আখ্যা দেয়।

মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বদর সিরিয়া চলে যান। তিনি তাঁর পরিবারকে বলেন, সেখানে ইসলামপন্থী বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিতে সিরিয়া যাচ্ছেন তিনি। পরে অবশ্য জানা যায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর আত্মঘাতী হামলায় মারা যান বদর।

আত্মঘাতী হামলায় প্রেসিডেন্ট সাদাতের মৃত্যুর পর থেকে মিসর কর্তৃপক্ষ বেশির ভাগ জঙ্গিকে কারাগারে পাঠিয়েছে বা মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত সপ্তাহে সাবেক প্রেসিডেন্ট মুরসিকে তাঁর শাসনামলে বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করার দায়ে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে ইসলামি জঙ্গিদের ক্ষমতা দখল থেকে দূরে রাখা গেলেও তারা এখনো হুমকি হয়ে আছে। রয়টার্স অবলম্বনে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here