আইএস খোরাসান কারা, তালেবানের সঙ্গে বিরোধ কেন?

আইএস খোরাসান কারা, তালেবানের সঙ্গে বিরোধ কেন?
ইসলামিক স্টেট খোরাসান নেতা হাফিজ সাঈদ। তিনি ২০১৫ সালে নিহত হন বলে দাবি করে আফগান সরকার

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস) খোরাসান। কারা এই গোষ্ঠী? তালেবানের সঙ্গে তাদের বিরোধ কেন?

বৃহস্পতিবার কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে জোড়া বিস্ফোরণে প্রায় একশ মানুষ নিহত হয়েছেন।

নিহতেদের মধ্যে ১৩ মার্কিন সেনা ও তালেবান রক্ষীরাও আছেন।

মার্কিন সেনা এবং যুক্তরাজ্যের সেনা আগে থেকেই ইসলামিক স্টেট খোরাসান নিয়ে সতর্কতা জারি করেছিল। তারা বলেছিল, কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে এই গোষ্ঠী শক্তি বাড়াচ্ছে। যে কোনো সময় তারা হামলা চালাতে পারে।

তালেবানও ইসলামিক স্টেট খোরাসানকে ঠেকাতে বিমানবন্দরের বাইরে চেকপোস্ট তৈরি করেছিল।

আইএস খোরাসান কারা

বলা হয়ে থাকে, আইএস জঙ্গিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইসলামিক স্টেট খোরাসান। মধ্যযুগে আফগানিস্তান, ইরান এবং মধ্য এশিয়ার একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে খোরাসান প্রদেশ বলা হতো। সেখান থেকেই খোরাসান শব্দটি নিয়েছে এই গোষ্ঠীটি।

তারা মনে করে, আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা করে তালেবান সমঝোতা করেছে। সে কারণেই তারা তালেবানকে এখন পছন্দ করছে না। তালেবান আফগানিস্তানের দখল নেওয়ার পর এই আইএস খোরাসানের সঙ্গে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষ হয়েছে। তাদের কিছু জঙ্গি তালেবানের হাতে মারা পড়েছে।

এছাড়া মতাদর্শগত বিভেদের কারণে দুউ গোষ্ঠীর মধ্যে শুরু থেকেই মিল নেই। তালেবান ইসলামের দেওবন্দি মতে বিশ্বাসী। আর ইসলামিক স্টেট বিশ্বাস করে সালাফি আন্দোলনে।

মার্কিন গোয়েন্দারা বলছেন, কাবুলে আইএস খোরাসানের প্রায় দেড় হাজার সদস্য জড়ো হয়েছে। তারা ক্রমাগত শক্তি বাড়াচ্ছে।

জাতিসংঘের একটি রিপোর্ট বলছে, ইসলামিক স্টেট খোরাসানের সদস্য সংখ্যা হাজার দশেক।

আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার

আফগানিস্তানের দখল নেওয়া তালেবান নিজেকে সংস্কার করলেই যে শান্তিতে দেশ চালাতে পারবে না, সেটা গত বৃহস্পতিবার কাবুল বিমানবন্দরে হামলার মধ্যে দিয়েই পরিষ্কার হয়ে গেছে। তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের আফগান শাখার (আইএস-কে) আত্মঘাতী ওই হামলায় প্রায় ১০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একাধিক সদস্যও রয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইএস-কে এখন তালেবানের প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুযোগ পেলেই আইএস জঙ্গিরা আফগানিস্তানে হামলা চালাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে বিদেশি বাহিনীর যুদ্ধ আর দখলদারির অবসান ঘটেছে আফগানিস্তানে। কিন্তু আফগানরা এখনো তাদের আগামী দিনের পথটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে না। নিজেদের ভবিষ্যৎ আঁচ করতে পারছে না ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসা তালেবানও। দুই দশকের সামরিক অভিযান শেষে যুক্তরাষ্ট্রও দেশে ফিরছে না-মেলা এক হিসাবের ফর্দ নিয়ে।

আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান নিয়ে গত মাসে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে পেন্টাগন। সেখানে মূলত উঠে এসেছে গত ২০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ভুল সিদ্ধান্তের কথা। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, রণকৌশল থেকে শুরু করে অর্থব্যয়—যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সিদ্ধান্তই যথাযথ ছিল না। বলা হচ্ছে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকেও মার্কিন প্রশাসন যেসব শিক্ষা নেয়নি, সেগুলো আফগান যুদ্ধ থেকে শিখে নিতে পারবে। কিন্তু যুদ্ধ যে কোনো সমাধান নয়, সেই উপলব্ধিটা বোধ হয় এখনো তাদের হয়নি।

প্রশ্ন উঠেছে, আফগানিস্তান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতিটা কেমন হবে? আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কিভাবে সংঘাতে না জড়িয়ে তালেবানের ওপর প্রভাব বিস্তার করা যায়, সেটাই হবে বাইডেন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান, ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারের মতো মুসলিম দেশগুলোর মাধ্যমে তারা তালেবানকে সব সময় চাপে রাখতে চাইবে। এ বিষয়ে এরই মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও শুরু করেছে ওয়াশিংটন। আগামী সপ্তাহে জি-সেভেন সম্মেলন ডেকেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সেখানে তিনি আফগান ইস্যুতে একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়ে আলোচনা করবেন।

কিন্তু তালেবান কিভাবে পশ্চিমাদের এই নীতিকে গ্রহণ করবে কিংবা কিভাবে দেশ চালাবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ একটা জিজ্ঞাসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত তালেবান যে আভাস দিয়েছে, তাতে এটা বোঝা যায় যে আগের মতো (১৯৯৬-২০০১) এবার তারা জনবিচ্ছিন্ন থাকতে চায় না। উইঘুর ইস্যুতে তীব্র মতবিরোধ থাকার পরও এরই মধ্যে তারা চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু করে দিয়েছে। ‘রোড অ্যান্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভ’-এর কারণে আফগানিস্তানের প্রতি চীনেরও আগ্রহের কমতি নেই। এরই মধ্যে তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়ার আভাস দিয়েছে তারা। অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু করে দিয়েছে তালেবান। তারা তুরস্কের সঙ্গেও বৈঠক করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন তালেবান নেতারা।

কিন্তু তালেবান নিজেকে সংস্কার করলেই যে শান্তিতে দেশ চালাতে পারবে না, সেটা গত বৃহস্পতিবার কাবুল বিমানবন্দরে হামলার মধ্য দিয়েই পরিষ্কার হয়ে গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আইএস-কে এখন তালেবানের প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুযোগ পেলেই আইএস জঙ্গিরা আফগানিস্তানে হামলা চালাবে। একসময় মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়াই করেছে তালেবান ও আইএস-কে। কিন্তু ‘জিহাদের পথ’ ছেড়ে তালেবান নেতারা আফগান সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় যোগ দেওয়ায় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।

বৃহস্পতিবারের হামলা ছিল সেই দূরত্বেরই একটি বহিঃপ্রকাশ। এ ধরনের বহিঃপ্রকাশ আগামী দিনে ঘটতেই থাকবে। এর বাইরে আরো অনেক গোষ্ঠী আছে, যারা তালেবানের শাসন চায় না। এসব গোষ্ঠীকে মোকাবেলা করে একটা শান্তিপূর্ণ আফগানিস্তান গড়ে তোলা তালেবানের পক্ষে সম্ভব হবে না বলেই মনে করেন বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ।

সূত্র : আলজাজিরা, এএফপি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here