অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির শেষ কোথায়?

অগ্নিকাণ্ডে জীবনহানি যেন ঠেকানোই যাচ্ছে না। কলকারখানায় বারবার ঘটছে অনাহূত অগ্নিকাণ্ড। নিভে যাচ্ছে শ্রমিকদের জীবনপ্রদীপ। আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করছে অনেক পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিকে। অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি আর পঙ্গুত্ব অসহায় হয়ে পড়ে স্বজনরা।

সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস লিমিটেড কারখানায় অগ্নিকাণ্ড অশনি সংকেত। ৫২টি তাজা প্রাণের প্রাণহানির কারণে স্বজনদের মর্মন্তুদ আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠেছে। রূপগঞ্জের হৃদয়বিধারক ও দুঃখজনক এই দুর্ঘটনা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপারটিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এমন নির্মম মৃত্যু সহজে মেনে নেওয়ার নয়।

আমরা প্রথমে রূপগঞ্জে কারখানার দুর্ঘটনা সম্পর্কে জানব। ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের হাসেম ফুডস লিমিটেডের কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। অগ্নিনির্বাপকযানের সাইরেন আর অসহায় মানুষের আর্তচিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। যখন আগুন জ্বলছিল কারখানায়, তখনো ভেতরে আটকা ছিল শ্রমিকেরা। কারখানার বাইরে ছিল উদ্বিগ্ন স্বজনদের আহাজারি।

একসময় কারখানা ভবনের ভেতর থেকে সাদা ব্যাগে করে একে একে পোড়া লাশ যখন বের করে আনেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বেশির ভাগ লাশ এতটাই পুড়ে গেছিল যে তাঁদের আর চেনার উপায় ছিল না। কে নারী, কে পুরুষ তা বুঝারও সুযোগ ছিল না। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করতে হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস লিমিটেডের কারখানা ভবনটি ছয়তলা। প্রতিটি ফ্লোর ৩৫ হাজার বর্গফুটের। সম্পূর্ণ ভবনটিতে সিঁড়ি ছিল মাত্র দুটি। এর মধ্যে ভবনের সামনের পথটি ব্যবহারের উপায় ছিল না। কারণ, আগুন এদিক থেকেই ছড়িয়েছে। ভবনের পেছনের দিকের পথ দিয়েও কেউ বের হতে পারছিলেন না তীব্র তাপ ও ধোঁয়ার কারণে। ফলে শ্রমিকেরা ছুটতে থাকেন ছাদের দিকে। কিন্তু ভবনের চার তলার সিঁড়ির গেট তালাবন্ধ থাকায় সেখানে আটকা প্রত্যেকেরই মৃত্যু হয়েছে, যারা কেউই ছাদ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি।

নিচের দিকে সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে ছিল আগুন। ফলে তারা নিচে নামতে পারেননি। মৃত্যু এসে হাজির হয়েছে। তারা ছাদে যেতে পারলে হয়তো তারা মারা যেতেন না। যারা অন্য সিঁড়ি দিয়ে ভবনের ছাদে আশ্রয় নিতে পেরেছিলেন তাদের ২৫ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এ আয়তনের একটি ভবনে অন্তত চারটি সিঁড়ি বা বহির্গমনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। চারটি সিঁড়ি থাকলে ৫২ শ্রমিকের প্রাণহানি সহজেই এড়ানো যেত। বিল্ডিং কোড মেনে পর্যাপ্ত সিঁড়ি রাখা হলে এত প্রাণহানি হতো না।

ছয়তলা ভবনে নিচতলায় কার্টন তৈরির কারখানা। দুই তলায় টোস্ট (বিস্কুট), তিনতলায় জুসসহ বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয় উৎপাদিত হতো। আর চারতলায় চকলেট ও লাচ্ছা সেমাই তৈরি হতো। পঞ্চম তলায় ভোজ্যতেল রাখা ছিল। আর ছয়তলায় ছিল কার্টনের গুদামঘর। আগুনের সূত্রপাত যখন হয়, তখন কারখানায় প্রায় ১৮০ জন শ্রমিক কাজে ছিলেন। নিচতলা থেকে আগুন সব কটি তলায় মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে ছড়িয়ে পড়ে। ভোজ্যতেলসহ পুরো ভবনে নানা ধরনের রাসায়নিক উপাদান ছিল। এসব দাহ্য বস্তুর কারণে আগুন নেভাতে অনেক সময় লেগেছে।

আগুনে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ এনে ৩০২সহ কয়েকটি ধারায় হত্যামামলা দায়ের করে পুলিশ৷ এরইমধ্যে কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল হাসেমসহ আট আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ ঘটনায় সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল হাসেমসহ আট জনকে আটক করেছে পুলিশ।

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আবুল হাসেমের চার ছেলেও রয়েছেন৷ তারা হলেন: হাসীব বিন হাসেম, তারেক ইব্রাহীম, তাওসীব ইব্রাহীম ও তানজিম ইব্রাহীম ৷ তারা সবাই কোম্পানিটির পরিচালক৷ এছাড়াও হাসেম ফুডসের উপমহাব্যবস্থাপক মামনুর রশীদ, প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. সালাউদ্দিন ও শাহান শাহ আজাদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ কারখানাটিতে শিশু শ্রমিক ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

আগুনে পুড়ে যাওয়া এই কারখানা সজীব গ্রুপ অব কোম্পানিজের মালিকানাধীন। সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম। তিনি ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপির প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে তাঁকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে নির্বাচন না করার কথা জানান দলকে। পরে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়েছেন। কিন্তু দল তাঁকে আর মনোনয়ন দেয়নি।

আসলে দুর্ঘটনাটি নতুন নয়। সারাদেশে আগুনের ঘটনা এবং এসব ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলছে। এবছর বিভিন্ন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে মারা গেছে ২ হাজার ১৩৮ জন। আহত হয়েছে ১৪ হাজার ৯৩২ জন। অথচ ২০০৯-২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে সারাদেশে আগুনের ঘটনায় মারা গেছে মোট একহাজার ৪৯০ জন। অর্থাৎ চলতি বছরে আগুনে মৃতের সংখ্যা গত ১০ বছরের দ্বিগুণ। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে সারাদেশে দেড় লাখ আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় একহাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু এবং ৬ হাজার ৯৪১ জন দগ্ধ হয়েছেন।

তবে শুধু ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ২২ হাজার ২৮৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় মারা গেছেন ২ হাজার ১৩৮ জন। দগ্ধ হন ১৪ হাজার ৯৩২ জন। এবছর আগুনের ঘটনায় ২০৩ কোটি ৯২ লাখ ৭৪ হাজার ৩১৫ টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে।

আগুনের ঘটনায় ২০০৯ সালে মারা যান ১১৮ জন, আহত হন ১ হাজার ৮৭ জন; ২০১০ সালে মৃত্যু ২৭১ জন, আহত ৭১৯ জন; ২০১১ সালে মৃত্যু ৩৬৫ জন, আহত ১ হাজার ৩৮৫ জন; ২০১২ সালে মৃত্যু ২১০ জন, আহত ৭৫৯ জন; ২০১৩ সালে মৃত্যু ১৬১ জন, আহত ১ হাজার ৩৮৫ জন; ২০১৪ সালে মৃত্যু ৭০ জন, আহত ২১০ জন; ২০১৫ সালে মৃত্যু ৬৮ জন, আহত ২১৬ জন; ২০১৬ সালে মৃত্যু ৫২ জন, আহত ২৪৭ জন; ২০১৭ সালে মৃত্যু ৪৫ জন, আহত ২৬৯ জন এবং ২০১৮ সালে মৃত্যু হয়েছে ১৩০ জনের এবং আহত হয়েছেন ৬৬৪ জন।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতেই ৩ হাজার ১৭৭টি আগুনের ঘটনায় মারা গেছেন ১৩০ জন ও আহত হয়েছেন এক হাজার ৭১ জন। ফেব্রুয়ারিতে ৩ হাজার ৪৪টি আগুনে ঘটনায় মারা যান ২৭৪ জন, আহত হন ১ হাজার ৩৭০ জন। মার্চে ২ হাজার ৯৩৮টি আগুনের ঘটনায় মৃত্যু ১১২ জন, আহত ১ হাজার ১৪৭ জন। এপ্রিলে ২ হাজার ৬৪২টি আগুনের ঘটনায় মৃত্যু ১৭৭ জন, আহত ১ হাজার ৪০০ জন।

মে মাসে ১ হাজার ৯২১টি ঘটনায় মৃত্যু ১০৬ জন, আহত ১ হাজার ৯৯ জন। জুনে ১ হাজার ৫১৭টি আগুনের ঘটনায় মৃত্যু ১৯৬ জন, আহত ১ হাজার ৭৩২ জন। জুলাইয়ে ১ হাজার ৩৪১টি ঘটনায় মৃত্যু ২৪৯ জন, আহত ১ হাজার ২৭৬ জন। আগস্টে ১ হাজার ৩৫৮টি আগুনের ঘটনায় মৃত্যু ২৫৩ জন, আহত ১ হাজার ৯৯৮ জন। সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৪৬৭টি আগুনের ঘটনায় মৃত্যু ২০৬ জন, আহত ১ হাজার ৩৯৫ জন।

অক্টোবরে ১ হাজার ৩২৪টি আগুনের ঘটনায় মৃত্যু ১৭৩ জন, আহত ১ হাজার ২৪৩ জন এবং নভেম্বরে ১ হাজার ৫৫৪টি আগুনের ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১৬২ জনের ও আহত হন এক হাজার একজন। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে দগ্ধ হয়ে মৃতের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি।

আর এবছরের আগস্টে আগুনে দগ্ধ আহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল। অন্য বছরের তুলনায় ২০১৯ সালে অগ্নিদুর্ঘটনা অনেক বেশি ছিল। প্রাণহানিও বেশি হয়েছে। বিশেষ করে চুড়িহাট্টা, বনানীর এফআর টাওয়ার, কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক কারখানা এবং গাজীপুরের ফ্যান কারখানায় হতাহত বেশি হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডে জীবনহানি ঠেকানো যাচ্ছে না কেন? নাজুক অবকাঠামো, ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা, কারখানার ডিজাইন ড্রয়িং ত্রুটি, তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বাইরে কাজ কারখানার নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায়। কলকারখানার দুর্ঘটনার হতাহত হওয়ার ঘটনা যথাযথ পূর্বসতর্কতা গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। সঠিক কর্তৃপক্ষের যাচাইকৃত অনুমোদন, সঠিক দুর্ঘটনাকালের জরুরি ব্যবস্থা পূর্বনিশ্চিতকরণ এবং শ্রমিকদের সচেতনতা বৃদ্ধিসহ এ ধরনের পদক্ষেপগুলো কলকারখানার দুর্ঘটনা প্রতিরোধের নিয়ামক।

নিমতলী, চুড়িহাট্টাায় দেখা গেছে কেমিকেল গোডাউন থেকে আগুন লেগে অনেকে মারা গেছেন৷ গুলশানসহ বড় বড় আগুনের ঘটনায় দেখেছি ভবনগুলোতে ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম নেই৷ থাকলেও কাজ করে না। রাজউকের বহুতল ভবনসংখ্যার বিপরীতে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র মিলিয়ে দেখা যায়, ২০১৮ পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার ভবন ছাড়পত্রহীন।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, গত ছয় বছরে সারা দেশে মোট অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৬০টি, তার মধ্যে শিল্পকারখানায় ৬ হাজার ৮১টি। আগুন লাগলে কোনো ভবনেরই নিরাপত্তাব্যবস্থা কাজ করে না। আসলে এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণই সময়ের দাবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here