Warning: Declaration of tie_mega_menu_walker::start_el(&$output, $item, $depth, $args) should be compatible with Walker_Nav_Menu::start_el(&$output, $item, $depth = 0, $args = Array, $id = 0) in /home/gnewsbdc/public_html/assets/themes/gnews theme/functions/theme-functions.php on line 1902
ইমাম গাজ্জালীর সংস্কার আন্দোলন | GNEWSBD.COM

ইমাম গাজ্জালীর সংস্কার আন্দোলন

উমর ইবনে আবদুল আযীযের পর রাষ্ট্র ও রাজনীতির লাগাম স্থায়ীভাবে জাহেলিয়াতের হাতে স্থানান্তরিত হয় এবং বনি উমাইয়া বনি আব্বাস ও তারপর তুর্কী বংশোদ্ভূত বাদশাহদের কর্তৃত্বের যুগ শুরু হয়্ এই বাদশাহ গণ যে কার্য সম্পাদন করেন তার সংক্ষিপ্তসার হলো এই যে, একদিকে তারা গ্রীক রোম ও অনারব দেশের জাহেলী দর্শনসমূহ হুবহু মুসলমানদের মধ্যে চালিয়ে দেন এবং অন্যদিকে নিজেদের অর্থ ও শক্তিবলে জ্ঞান-বিজ্ঞান শিল্প, সংস্কৃতি ও সামাজিকতার মধ্যে ইসলাম -পূর্ব যুগের জাহেলীয়াতের যাবতীয় বিবৃত ব্যবস্থা ব্যাপক প্রচলন করেন। বনি আব্বাসীয় রাজবংশের অবনতির কারণে ক্ষতির পরিমাণ আরো বর্ধিত হয়। প্রথম দিকের আব্বাসীয় খলিফাদের পর রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ক্ষমতা যাদের হাতে স্থানান্তরিত হয় তারা দিনী ইলম থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিলেন। কাজী ও মুফতির পদে যোগ্যতার লোক নির্বাচন করার যোগ্যতাও তাদের ছিলনা। নিজেদের মূর্খতা ও আয়েশ পরস্তির কারণে শরিয়তের নির্দেশাবলী প্রবর্তনের কাজ তারা এমন গতানুগতিক পদ্ধতিতে করতে চাইতেন যাতে কোনো প্রকার কষ্ট স্বীকার করার প্রয়োজন না হয়। আর এ জন্যে অন্ধ অনুসারিতার পথই ছিল উপযোগী। উপরন্ত স্বার্থবাদী আলেম সমাজ তাদেরকে মযহাবী বিতর্কযুদ্ধ আয়োজনে অভ্যস্থ করে তোলেন। অতঃপর রাজানুগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় এ ব্যাধি এতদূর বিস্তার লাভ করে যে, এর ফলে সমস্ত মুসলিম রাষ্ট্রে ফেরকাবাজী মতবিরোধ ও হানাহানি মহামারির ন্যায় প্রসার লাভ করে। আমীর-ওমরাহ ও বাদশাহদের জন্যে এই নিছক একটি আমোদ ও বিলাসিতা। কিন্তু সাধারণের জন্যে এটি কাচির কাজ করে এবং তাদের দ্বীনি ঐক্যকে কেটে টুকরো টুকরো করে দেয়। পঞ্চম শতকে পৌঁছতে পৌঁছতে অবস্থা এই পর্যায়ে এসে যায় যেঃ

(১) গ্রীক দর্শনের প্রচারের ফলে আকিদা-বিশ্বাসের বুনিয়াদ নড়ে ওঠে। মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ ন্যায়শাস্ত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। তাই তারা দ্বীনকে যুগের চাহিদা অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত পদ্ধতিতে বুঝাতে পারতেন না এবং ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আকিদা বিশ্বাসের গোমরাহীকে দাবিয়ে দেবার চেষ্টা করতেন। ন্যায়শাস্ত্রে যারা বিপুল জ্ঞানের অধিকারী বলে পরিচিত ছিলেন তাঁরা কেবল ইসলামী শাস্ত্রে পরাদর্শী ছিলেন না। বরং ন্যায়শাস্ত্রেও ইজতিহাদ করার মতো যোগ্যতা তাদের ছিলনা। তারা গ্রীক দার্শনিকদের দাস ছিলেন। সমালোচনার দৃষ্টিতে এই গ্রীক সাহিত্য পর্যালোচনা করার মতো গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন লোকও তাদের মধ্যে ছিল না। গ্রিক ওহীকে অপরিবর্তনীয় মনে করে তারা হুবাহু তাকে স্বীকার করে নেন এবং আসমানী ওহীকে গ্রীক ওহী অনুযায়ী ঢালাই করার জন্যে তাকে বিকৃত করতে উদ্যেগী হন। এ পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মুসলমান ইসলামকে যুক্তিবিরোধী মনে করতে থাকে। তার প্রত্যেকটি বিষয় তাদের চোখে সন্দেহপূর্ণ হিসাবে প্রতিভাত হয়। তারা মনে করতে থাকে যে, আমাদের দ্বীন লজ্জাবতী লতার ন্যায় স্পর্শকাতর, বুদ্ধির পরীক্ষার সামান্য স্পর্শেই তা ঝিমিয়ে পড়ে। ইমাম আবুল হাসান আশয়ারী ও তাঁর অনুসারীরা এই ধারার পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন। এ দলটি ইলমে কালাম সম্পর্কে অবগত ছিলেন কিন্তু ন্যায় শাস্ত্রের দুর্বলতগুলো সম্পর্কে তাঁরা মোটেই ওয়াকেফহাল ছিলেন না। তাই তাঁরা এই ব্যাপক ও সর্ব পর্যায়ের আকিদা বিকৃতির গতি পরিবর্তন করতে পুরোপুরি সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। বরং মোতাজিলাদের প্রতি জিদের বশে তাঁরা এমন অনেক কথা গ্রহণ করেন, যা আসলে দ্বীনি আকিদার অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

(২) মূর্খ শাসকের প্রভাবে এবং দ্বীনি ইলমসমূহ বস্তুগত উপায়- উপকরণের সাহায্য বঞ্চিত হবার কারণে ইজতিহাদের ধারা শুকিয়ে যায় অন্ধ অনুসারিতার ব্যাধি বিস্তারলাভ করে, মজহাবী মতবৈষম্য অধিকতর ব্যাপক ও প্রবল হয়ে খুঁটিনাটি বিষয়ৈর ভিত্তিতে নতুন নতুন ফেরকা সৃষ্টি করে এবং এসব ফেরকার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব মুসলমানদেরকে যে, ———– (জলন্ত অগ্নিকুণ্ডের ওপর) এর পর্যায়ে স্থাপন করে।

(৩) পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত মুসলিম জাহানের সর্বত্র নৈতিক অবনতি দেখা যায়। কোনো একটি শ্রেণীও এর প্রভাবমুক্ত থাকেনি। মুসলমানদের সমাজ জীবন কোরআন ও নবুয়্যাতের আলোক থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত হয়ে যায়। হেদায়েত ও পথের সন্ধানে খোদার কিতাব এবং রসূলের সুন্নতের দিকে ফিরে আসা উচিত, একথা আলেম সমাজ আমীর-ওমরাহ ও জনসাধানণ সবাই বিস্মৃত হয়।

(৪) রাজদরবারী, রাজপরিবার ও শাসক শ্রেণীর বিলাসবহুল জীবনযাত্রা ও স্বার্থবাদী যুদ্ধের কারণে অধিকাংশ স্থলে প্রজাসাধারণ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছিল। অবৈধ করের বোঝা তাদের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়েছিল। যেসব বিদ্যা কৃষ্টি-তমুদ্দুনকে প্রকৃতপক্ষে লাভবান করে, সেগুলো ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। রাজদরবারে যেসব শিল্প মর্যাদাসম্পন্ন ছিল কিন্তু নৈতিক বৃত্তিও তমুদ্দেনের জন্যে ছিল ধ্বংসের কেবল সেগুলিরই ডংকা বাজছিল। চারপাশের অবস্থা ও নিদর্শনসমূহ সুস্পষ্টভাবে ঘোষনা করছিল যে, ব্যাপক ধ্বংসের সময় নিকটবর্তী।

পঞ্চম শতকের মধ্যভাগে এহেন পরিস্থিতিতে ইমাম গাজ্জালী জন্মগ্রহণ করেন১১। সে যুগে যে শিক্ষা পার্থিব উন্নতির বাহন হতে পারতো, প্রথমতঃসেই ধরনের শিক্ষা তিনি লাভ করেন। বাজারে যেসব বিদ্যার চাহিদা ছিল, তাতেই তিনি পারদর্শিতা অর্জন করেন। অতঃপর এ বস্তুকে নিয়ে তিনি ঠিক সেখানেই পৌঁছেন সেখানকার জন্যে এটি তৈরী হয়েছিল এবং তৎকালে একজন আলেম যতদূর উন্নতির কল্পনা করতে পারতেন, ততদূর তিনি পৌঁছে যান।

তিনি তৎকালীন দুনিয়ার বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় বাগদাদের নেজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রেকটর নিযুক্ত হন। নেজামুল মুলক তুসী মালিক শাহ সালজুকী ও বাগদাদের খলিফার দরবারে যোগ্য আসন লাভ করেন। সমকালীন রাজনীতিতে এত বেশী প্রভাব বিস্তার করেন যে, সালজুকী শাসক ও আব্বাসীয় খলিফার মধ্যে সৃষ্ট মতবিরোধ দুর করার জন্যে তাঁর খেদমত হাসিল করা হতো। পার্থিব উন্নতির এই পর্যায়ে উপনিত হবার পর অকস্মাৎতাঁর জীবনে বিপ্লব আসে। নিজের যুগের তত্ত্বগত নৈতিক ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও তমুদ্দুনিক জীবনধারাকে যত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন, ততই তাঁর মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে থাকে এবং ততই বিবেক তারস্বরে শুরু করে যে, এই পুঁতিগন্ধময় সমুদ্রে সন্তরণ করা তোমার কাজ নয়, তোমার কাজ অন্য কিছু। অবশেষে সমস্ত রাজকীয় মর্যাদা, লাভ, মুনাফা, ও মর্যদাপূর্ণ কার্যসমূহেকে ঘৃণাভাবে দূরে নিক্ষেপ করেন। কেননা এগুলোই তার পায়ে শিকল পরিয়ে দিয়েছিল। অতঃপর ফকির বেশে দেশ পর্যটনে বেরিয়ে পড়েন। বনে-জংগলে ও নির্জন স্থানে বসে নিরিবিলিতে চিন্তায় নিমগ্ন হন। বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মুসলমানদের সংগে মেলামেশা করে তাদের জীবনধারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। দীর্ঘকাল মোজাহাদা ও সাধনার মাধ্যমে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে থাকেন। ৩৮ বছর বয়সে বের হয়ে পূর্ণ দশ বছর পর ৪৮বছর বয়সে ফিরে আসেন। ওই দীর্ঘকালীন চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের পর তিনি যে কার্য সম্পাদন করেন তা হলো এই যে, বাদশাহদের সংগে সম্পর্কেচ্ছেদ করেন। এবং তাদের মাসোহারা গ্রহণ করা বন্ধ করেন। বিবাদ ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকার জন্যে শপথ করেন। সারকারী প্রভাবাধীনে পরিচালিত শিক্ষায়তনসমূহে কাজ করতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন এবং তুসে নিজের একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান কায়েম করেন। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নির্বাচিত ব্যক্তিদের বিশেষ পদ্ধতিতে তালিম দিয়ে তৈরী করতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু সম্ভবতঃ তাঁর এ প্রচেষ্টা কোনো বিরাট বৈপ্লবিক কার্য সম্পাদন করতে সক্ষম হয়নি, কেননা এ পদ্ধতিতে কাজ করার জন্যে তাঁর আয়ু তাঁকে পাঁচ ছয় বছরের বেশী অবকাশ দেয়নি।

ইমাম গাজ্জালী (র) এর সংস্কারমূলক কাজের সংক্ষিপ্তসার হলো এইঃ

এক.

গ্রীক দর্শন গভীরভাবে অধ্যায়ন করার পর তিনি তার সমালোচানা করেন এবং জবরদস্ত সমালোচানা করেন যে, তার যে শ্রেষ্ঠত্ব ও শক্তিমত্তা মুসলমানদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল, তা হ্রাসপ্রাপ্ত হয় এবং লোকেরা যে সমস্ত মতবাদকে চরম সত্য বলে মেনে নিয়েছিল, কোরআন ও হাদীসের শিক্ষাসমূহকে যার ফলে ছাঁচে ঢালাই করা ছাড়া দ্বীনের উদ্ধারের আর কোন উপায় পরিদৃষ্ট হচ্ছিল না, তার আসল চেহারা অনেকাংশে জনগণের সম্মুখে উম্মক্ত হয়ে যায়। ইমামের এই সমালোচানার প্রভাব শুধু মুসলমান দেশসমূহেই সীমাদ্ধ থাকেনি বরং ইউরোপে উপনীত হয় এবং সেখানে গ্রীক দর্শনের কর্তৃত্ব খতম করার এবং আধুনিক সমালোচনা ও গবেষণা যুগের দ্বারোদঘাটন করার ব্যাপারে অংশগ্রহণ করে।

দুই.

ন্যায় শাস্ত্র গভীর জ্ঞান না রাখার কারণে ইসলামের সমর্থকগণ দার্শনিক ও মুতাকাল্লিমদের মোকাবিলায় যেসব ভুল করছিল তিনি সেগুলো সংশোধন করেন। পরবর্তীকালে ইউরোপের পাদ্রিরা যে ভুল করেছিল ইসলামের এই সমর্থকরা ঠিক সেই পর্যায়ে ভূল করে চলছিল। অর্থাৎ ধর্মীয় আকিদা-বিশ্বাসের যুক্তি প্রমাণকে কতক সুস্পষ্ট অযৌক্তিক বিষয়াবলীর ওপর নির্ভরশীল মনে করে অযথা সেগুলোকে মূলনীতি হিসেবে গণ্য করা, অতঃপর ঐ মনগড়া মূলনীতিগুলোকেও ধর্মীয় আকিদা-বিশ্বাসের মধ্যে শামুল করে যারা সেগুলো অস্বীকার করে তাদেরকে কাফের গণ্য করা আর যে সমস্ত দলিল প্রমান অভিজ্ঞতা বা পর্যবেক্ষণের সাহায্যে মনগড়া ঐ নীতিগুলোর গলদ প্রমাণিত হয়, সেগুলোকে ধর্মের জন্যে বিপদস্বরুপ মনে করা। এ জিনিসটিই ইউরোপকে নাস্তিক্যবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মুসলিম দেশ সমুহে এ জিনিসটিই বিপুল বিক্রমে কাজ করে যাচ্ছিল এবং জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করছিল। কিন্তু ইমাম গাজ্জালী যথাসময়ে এর সংশোধন করেন। তিনি মুসলমানদেরকে জানান যে, অযৌক্তিক বিষয়সমুহের ওপর তোমাদের ধর্মীয় আকিদা-বিশ্বাসের প্রমাণ নির্ভরশীল নয় বরং এর পেছনে উপযুক্ত প্রমাণ আছে। কাজেই ঐ গুলোর ওপর জোর দেয়া অর্থহীন।

তিন.

তিনি ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস ও মুলনীতিসমূহের এমন যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা পেশ করেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে কমপক্ষে সে যুগে এবং তার পরবর্তী কয়েক যুগ পর্যন্ত ন্যায়শাস্ত্র ভিত্তিক কোনো কোনো প্রকার আপত্তি উত্থাপিত হতে পারতো না। এই সংগে তিনি শরিয়তের নির্দেশাবলী এবং ইবাদতের গূঢ় রহস্য ও যৌক্তিকতাও বর্ণনা করেন এবং এমন একটি চিত্র পেশ করেন যার ফলে ইসলাম যুক্তি ও বুদ্ধির পরীক্ষার বোঝা বহন করতে পারবে না বলে যে ভুল ধারণা মানুষের মনে স্থানলাভ করেছিল, তা বিদূরিত হয়।

চার.

তিনি সমকালীন সকল মযহাবী ফেরকা এবং তাদের মতবিরোধ পূর্ণরূপে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে ইসলাম ও কুফরের পৃথক পৃথক সীমারেখা নির্ধারণ করেন এবং কোন সীমারেখার মধ্যে মানুষের জন্যে মত প্রকাশ ও ব্যাখ্যা করার স্বাধীনতা আছে, কোন সীমারেখা অতিক্রম করার অর্থ ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া ইসলামের আসল আকিদা বিশ্বাস কি কি এবং কোন কোন জিনিসকে অনর্থন ইসলামী আকিদার মধ্যে শামিল করা হয়েছে তা বিবৃত করেন। তাঁর এই পর্যালোচনার ফলে পরস্পর বিবদমান ও পরস্পর কাফের আখ্যাদানকারী ফেরকাসমুগের সুড়ঙ্গের মধ্য হতে অনেক বারুদ বের হয়ে যায় এবং মুসলমানদের দৃষ্টিভংগীতে ব্যাপকতা সৃষ্টি হয়।

পাঁচ.

তিনি দ্বীনের জ্ঞানকে সঞ্জীবিত ও সতেজ করেন। চেতনাবিহীন ধার্মিকতাকে অর্থহীন গণ্য করেন। অন্ধ অনুসৃতির কঠোর বিরোধাতা করেন। জনগণকে পুনর্বার খোদার কিতান ও রসূলের সুন্নতের উৎস ধারার দিকে আকৃষ্ট করেন। ইজতিহাদের প্রাণশক্তিকে সঞ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। এবং নিজের যুগের প্রায় প্রত্যেকটি দলের ভ্রান্তি ও দূর্বলতার সমালোচনা করে তাদেরকে ব্যাপকভাবে সংশোধনের আহবান জানান।

ছয়.

তিনি পুরাতন জরাজীর্ন শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করেন এবং একটি নয়া শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকল্পনা পেশ করেন। সে সময় পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে যে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন ছিল, তার মধ্যে দুই ধরনের ত্রুটি পরিলক্ষিত হচ্ছিল। প্রথমটি হলো এই যে, দ্বীন ও দুনিয়ার শিক্ষাব্যস্থা পৃথক ছিল। এর ফলস্বরূপ দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যে পৃথকীকরণ দেখা দেয়। ইসলাম এটিকে মূলতঃভ্রান্ত মনে করে। দ্বিতীয়টি এই যে, শরিয়তের জ্ঞান হিসাবে এমন অনেক বিষয় পাঠ্য তালিকাভুক্ত ছিল, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ন ছিল না। এর ফলে দ্বীন সম্পর্কে জনগনের ধারণা ভ্রান্তিতে পরিপূর্ন হয়ে যায় এবং কতিপয় অপ্রয়োজনীয় বিষয় গুরুত্ব অর্জন করার কারণে ফিরকাগত বিরোধ শুরু হয়। ইমাম গাজ্জালী (র) এই গলদগুলো দূর করে একটি সুসামঞ্জস্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর সমকালীন লোকেরা তাঁর এই মহান কর্মকাণ্ডের ঘোর বিরোধিতা করে। কিন্তু অবশেষে সকল মুসলিম দেশে এ নীতি স্বীকৃতি লাভ করে এবংপরবর্তীকালে যতগুলো শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় তার সবগুলোই ইমাম নির্ধারিত পথেই প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানকাল পর্যন্ত আরবী মাদ্রাসাসমুহের কারীকুলামে যে সমস্ত ব্ই শামিল আছে, তার প্রাথমিক নকসা ইমাম গজ্জালী (র) তৈরী করেন।

সাত.

তিনি জনসাধারণের নৈতিক চরিত্র পূর্ণরূপে পর্যালোচনা করেন। উলামা, মাশায়েখ, আমির-ওমরাহ, বাদশাহ ও জনসাধাণের প্রত্যেকের জীবন প্রণালী অধ্যয়নের সুযোগ তিনি পান। নিজে পরিভ্রমন করে প্রাচ্য জগতের একটি অংশের অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর এহইয়া -উল-উলুম কিতাবটিএই অধ্যায়নের ফল। এ কিতাবে তিনি মুসলমানদের প্রত্যেকটি শ্রেণীর নৈতিক অবস্থার সমালোচনা করেন, প্রত্যেকটি দুষ্কৃতির মূল এবং তার মনস্তাত্ত্বিক ও তমুদ্দুনিক কারণসমুহ অনুসন্ধান করেন এবং ইসলামের নির্ভুল ও সত্যিকার নৈতিক মানদণ্ড পেশ করার চেষ্টা করেন।

আট.

তিনি সমকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থারও অবাধ সমালোচনা করেন্ সমকালীন শাসক গোষ্ঠিকেও সরাসরি সংশোধনের দিকে আকৃষ্ট করতে থাকেন এবং এই সংগে জনগণের মধ্যেও জূলুম-নির্যাতনের সম্মুখে স্বেচ্ছায় নত না হয়ে অবাধ সমালোচনা করার প্রেরণা সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। এহইয়া-উল-উলুম এর একস্থানে লেখেনঃআমাদের জামানার সুলতানদের সমস্ত বা অধিকাংশ ধন-সম্পদ হারাম। আর একস্থানে লেখেন এই সুলতানদের নিজেদের চেহারা অন্যকে না দেখানো উচিত এবং অন্যদের চেহারা না দেখা উচিত। এদের জুলুমকে ঘৃণা করা এদের অস্তিত্বকে পছন্দ না করা, এদের সংগে কোন প্রকার সম্পর্ক না রাখা এবং এদের সংগে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের থেকেও দূরে অবন্থান করা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে অপরিহার্য। অপর একস্থানে দরবারে প্রচলিত আদব -কায়দা ও বাদশাহ পুজার সমালোচনা করেন বাদশাহ ও আমির -ওমরাহর অনুসৃত সামাজিক রীতিনীতির নিন্দা করেন, এমনকি তাদের দালান কোঠা পোশাক-পরিচ্ছদ গৃহের সাজসরঞ্জাম সব কিছুকেই নাপাক গণ্য করেন। শুধু এখানেই ক্ষান্ত হননি বরং তিনি নিজের যুগের বাদশাহদের নিকট একটি বিস্তারিত পত্র লেখেন। পত্রের মাধ্যমে তাঁকে ইসলাম প্রবর্তিত রাষ্ট্র পদ্ধতির দিকে আহবান জানান, শাসকের দায়িত্ব বুঝান এবং তাঁকে জানান যে, তাঁর দেশে যে জুলুম হচ্ছে তা তিনি নিজেই করেন বা তাঁর অধীনস্থ কর্মচারীরা করেন, সবকিছুর জন্যে তিনিই দায়ী। একবার বাধ্য হয়ে রাজ দরবারে যেতে হয় তখন আলোচনা প্রসংগে বাদশাহর মুখের ওপর বলেনঃ

“স্বর্ণ অলংকারের ভারে তোমার ঘোড়ার পিঠ ভাঙেনি তো কি হয়েছে, অনাহারে -অর্ধহারে মুসলমানদের পিঠতো ভেঙে গিয়েছে”।

তাঁর শেষ যুগে যে সকল উজির নিযুক্ত হন তাদের প্রায় সবার নিকট তিনি পত্র লেখেন এবং জনগনের দুরবস্থার প্রতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জনৈক উজিরকে লেখেনঃ

“জুলুম সীমা অতিক্রম করেছে। যেহেতু আমাকে স্বচক্ষে এসব দর্শন করতে হতো তাই নির্লজ্জ ও নির্দয় জালেমদের কীর্তিকলাপ প্রত্যক্ষ না করার জন্যে প্রায় এক বছর থেকে আমি তুসের আবাস উঠিয়ে নিয়েছি”।

ইবনে খালদুনের বর্ণনা মতে এতদূর জানা যায় যে, তিনি পৃথিবীর যে কোনো এলাকাতেই হোক না কেন নির্ভেজাল ইসলামী নীতি ও আদর্র্শের ভিত্তিতে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করতেন। কাজেই তাঁর ইংগিতেই দুর প্রতীচ্যে (আফ্রিকায়) তাঁর জনৈক ছাত্র, মুওয়াহিদ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ইমাম গাজ্জালীর কর্মকাণ্ডে এই রাজনৈতিক রূপ ও রং নেহাতই গৌণ ছিল। রাজনৈতিক বিপ্লব সাধনের জন্যে তিনি কোনো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালাননি এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থার ওপর সামান্যতম প্রভাব ও বিস্তার করতে সক্ষম হননি। তাঁর পরবর্তীকালে জাহেলীয়াতের কর্তৃত্বাধীনে মুসলিম জাতিসমূহের অবস্থা উত্তরোত্তর অবনতির দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এমনকি এক শতাব্দির পর তাতারীরা তুফানের ন্যায় মুসলিম দেশসমুহের ওপর দিয়ে ছুটে চলে এবং তাদের সমগ্র তমুদ্দুনকে বিধ্বস্ত করে দেয়।

ইমাম গাজ্জালীর (র) সংস্কারমূলক কাজের মধ্যে কতিপয় তত্ত্ব ও চিন্তাগত ত্রুটিও ছিল। এ গুলোকে তিনভাগে ভাগ করা যেতে পারে। হাদীস শাস্ত্রে দুর্বল হবার কারণে তাঁর কার্যাবলীতে এক ধরনের ত্রুটি দেখা দেয়। ১২ দ্বিতীয় ধারণের ত্রুটি তাঁর বুদ্ধিবৃত্তির ওপর যুক্তিবাদিতা ও ন্যায় শাস্ত্রের কর্তৃত্বের কারণে সৃষ্টি হয়। তৃতীয় ধরনের ত্রুটির উৎপত্তি হয় তাসাউফের দিকে প্রয়োজনাতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার কারণে।

এই দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠে ইমাম গাজ্জালীর (র) আসল কাজ অর্থাৎ ইসলামের চিন্তাগত ও নৈতিক প্রমাণশক্তিকে সঞ্জীবিত করার এবং বেদআত ও গোমরাহির নির্দশনসমূহ চিন্তা জগত ও তমুদ্দুনিক জীবনধারা থেকে ছাঁটাই করার কাজকে যিনি অগ্রসর করেণ তিনি হচ্ছেন ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র) ।

১২.ইমাম গাজ্জালী তাঁর এহইয়া-উল-উলুম কিতাবে এমন অনেক হাদীস উদ্ধৃত করেছেন, যে গুলোর সনদ পাওয়া যায় না, তাজদ্দিন সাবাকী তাঁর তাবকাতে শাফেঈয়ায় সেগুলো একত্রিত করেছেন। – (দেখুন-তাবকাত চতুর্থ খন্ড, পৃষ্ঠা-১৪৫ থেকে ১৮২)