কি করবে প্রবাসী বাবারা?

এইচ আল বান্না : দীর্ঘ ধরে যে বাবারা প্রবাসে আছেন তাদের জন্য দেশে এলে জীবনটা একটু কষ্টের মনে হতে পারে।

যারা টেম্পোরারি আসেন তাদের কথা আলাদা, কিন্তু যারা পার্মানেন্টলি আসেন বা আসতে চাচ্ছেন তাদের জন্য জগতটা খুব কষ্টকর হয়ে ওঠে।

প্রথমত সন্তানদের অনেক আচরণ তাদের কাছে খারাপ লাগে, বেয়াদবি মনে হয়। কারণ ২টা, এক তিনি সন্তানের সাথে মিশতে পারেন নি, দুই সন্তানের বেড়ে ওঠার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় তাঁর পরিবর্তনগুলো সহনীয় ভাবে অবলোকনের সুযোগ পান নি।

অনেক কিছু আছে যেগুলোস সময়ের কারণে বেয়াদবি হয়ে ওঠা। যেমন ধরেন এই সময়ের বাচ্চারা অনেক প্রশ্ন করে, এবং মুখের ওপর এমন অনেক প্রশ্ন করে বসে যেগুলো আমাদের সময়ে আমরা কল্পনা করতাম না। এটা কিন্তু আপনি চাইলে বেয়াদবি বলতে পারেন, কিন্তু এটা আসলে সময়ের পরিক্রমা।

ভাষা আরেকটা সমস্যা, আপনি যখন ২০ বছর আগে বাংলাদেশকে কিংবা নিজের দেশকে ফেলে গেছেন তখন আপনি সাথে করে সেই সময়ের ভাষা ও সামাজিক সম্পর্কের দৃশ্যত রূপগুলো সঙে করে নিয়ে গেছেন।

গিয়ে সেখানে যাদের সঙে মিশেছেন বা থেকেছেন তারাও আপনার সমবয়সী, কিংবা সম চিন্তার মানুষ। আর বিদেশে মানুষ যখন কাজের জন্য বা ব্যবসার জন্য যায় তখন তারা থাকে সম্পূর্ন ভিন্ন একটা সংস্কৃতিতে। নিজের দেশের সংস্কৃতিক উপাদানে কি কি পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে সেসব টের পান না। ইভেন মোয়ামেলাতের ধরনগুলো কোন কোন নর্মসে বা ধরণে বদলাচ্ছে তাও তাদের পক্ষে ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পরে।

আবার অন্যদিকে তারা কি করবে সেটা নিয়েও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পরে। প্রফেশোনলী কোন কাজেই সেট হওয়া যায় না। অনেকদিন দেশে নাই, দেশের ব্যাবসা বা চাকুরীর ট্র্যাকটাও হারিয়ে ফেলেছে। এমনকি সেই সময়ের বন্ধুরাও এখন কে কোথায় আছে জানা নেই হয়ত। বগি এখন ঠায় দাঁড়িয়ে, কোন রেললাইন ধরে স্টেশনে পৌঁছুবে?

আমাদের সময়ে বাবা মায়েরা খুব সুশৃঙ্খল ভাবে পরিবার গঠন করেছেন। যেখানে সব কিছুর একটা টাইমিং ছিল। আজকাল সেই টাইমিং গুলো সব কেমন যেন এলোমেলো লাগে। খাওয়ার টাইমের ঠিক নাই, গোসলের ঠিক নাই, ঘুমের ঠিক নাই। এটা আমার বেলায়ও। আমিও বদলেছি এই স্রোতের ধাক্কায়।

তো প্রবাসী বাবারা হুট করে এসে দেখে যে সব কিছু কেমন এলোমেলো। ইভেন অনেক কনজার্ভেটিভ বাবারা সমাজকে এক ভাবে চিন্তা করেছে, এসে দেখে পোলাপান ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে মিশছে, একে অন্যের সাথে হাসাহাসি করছে, ভার্সিটিতে পড়ছে, এগুলো সেই কনজার্ভেটিভ মাইন্ডে ধারণ করা খুব কঠিন হয়ে পরে। অথচ সন্তানের কাছে কিন্তু এটাই বর্তমান। এভাবেই সবাই চলে, এবং এটাকে কেউ খারাপ মনে করছে না।

কিন্তু বাবার বুকের মধ্যে ক্ষততে আগুন জ্বলে। ভেতরে ভেতরে ভীষণ কষ্ট পায়।

আমরাও বুড়া হবো। যদি সন্তান পরিবার থেকে দূরে থাকি তবে আমাদেরও এমন লাগবে।

সত্যজিতের “মহানগর একা” সিনেমায় সংসারের টানাপড়েন দেখে বউ চাকরী করতে বের হয়। আর সে নিয়ে শ্বশুরের কি যে মনঃকষ্ট। শশ্বুর “বোল” সিনেমার হেকিমের মত নিজের একটা বানানো আত্মসম্মানবোধের যন্ত্রণায় ছাত্রদের কাছে গিয়ে টাকা চায়। ছেলের রোজগেরে গিন্নির টাকা সে নিবে না, কিন্তু ভিক্ষা করবে। এবং রাগ করে বউকে বলে “Im too old to change my mind” অথচ যখন ছেলের চাকরিটাও চলে যায় তখন বউয়ের ইনকামেই সংসারটা চলছিল। তখন বাধ্য হয়ে মেনে নেয়।

আসলেই চারপাশ ভীষণ ভাবে বদলে গেছে, ক্যাপিটালিজম আর কঞ্জুমারিজম এই দুইয়ে মিলে ভীষণ ভাবে বদলে দিচ্ছে আমাদের আদব, কালচার আর সামাজিক মূল্যবোধের দুয়ারগুলো। ধীরে বদলে গেছে কপাট, বদলে গেছে জানালার শিক। এখন ঘরখানা কেবল এলোমেল কিছু কাঠ পেরেকের জঙ্গল লাগে।