কে সফল, কে ব্যর্থ?

মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম

পৃথিবীতে সফল হওয়ার জন্য মানুষের রাত-দিন কঠোর পরিশ্রম, তুমুল সংগ্রাম, দ্বন্দ্ব-হিংসা ও স্বার্থের বিবাদ লেগেই আছে। কিন্তু কোথাও পাওয়া যায় না নিখাদ সফলতা। সফল হওয়ার কৌশল নিয়ে শত শত বই বেরিয়েছে। সেসব বই শত কোটি মানুষ পড়ছে; কিন্তু সত্যিকারের সফল মানুষ কি আমরা পাচ্ছি কিংবা যাদের আমরা ‘সফল’ বলছি, তারা কি সত্যিকারের সফল? মানুষ ও সৃষ্টির কল্যাণে তারা কি আনছেন কোনো সুফল?

মহানবী হজরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা সা:, যিশু খ্রিষ্ট, গৌতম বুদ্ধ, স্বামী বিবেকানন্দ কিংবা কনফুসিয়াস, প্লেটো, নিউটন, অ্যারিস্টটল, আইনস্টাইন, লুই পাস্তুর, গ্যালিলিও, জেমস ওয়াট, মাইকেল ফ্যারাডে, টমাস এডিসন কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জর্জ ওয়াশিংটন, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা কিংবা মাদার তেরেসা, হেনরি ডুনান্ট- এ রকম শত শত প্রকৃত সফল মানুষ সফলতার জন্য কি কোনো বিশেষ বই পড়েছেন? তারা কি লাখো কোটি টাকার সম্পদ গড়ে গেছেন সফল খেতাব পেতে? তাহলে তারা কেন সফল? উত্তর আপনি নিজেই পাবেন আর বুঝবেন আসলেই সফলতা কী? আর তখন আপনার হা-হুতাশ, অহঙ্কার-উল্লম্ফন, হিংসা-বিদ্বেষ, আক্ষেপ-আফসোস কিছুই থাকবে না।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, পারিবারিক-সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক প্রত্যাশা এবং মূল্যবোধের দূষণে সৃষ্ট বিবেকের বধিরতা, অন্ধত্ব সর্বোপরি ‘পক্ষাঘাতগ্রস্ততা’র কারণে আমরা সফলতার এক আশ্চর্য সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছি আর ভোগবাদী বা পুঁজিবাদী মানদণ্ডে সেই সফলতাকে বিচার করছি। সেই মানদণ্ড আমাদের আবহমান বাংলার মূল্যবোধের মানদণ্ডে যাচিত সফলতাকে বহুকাল আগে কবর দিয়েছে। আমরা সেসব কথিত মানদণ্ডে সফলতা বা বিফলতা নির্ণয় করি, উৎসাহিত বা হতাশ হই, পুরস্কৃত বা তিরস্কৃত হই। ক্ষেত্রবিশেষে সফলতার এমন অহঙ্কারে পূর্ণ হই যে ধরাকে সরাজ্ঞান করি, নিজেকে ছাড়া কাউকে মানুষ ভাবি না কিংবা বিফলতায় এমনই মুুষড়ে পড়ি যে, আত্মহননের পথ বেছে নিই।

আমাদের বর্তমান সমাজ ভোগবাদী, সম্পদ আর ক্ষমতার পূজারী। কারণ, অবাধ ইন্টারনেটে ভোগবাদিতার, সুখের, সম্পদের প্রচার-প্রচারণা ও আকাশ সংস্কৃতির কারণে সম্পদ গড়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের অনুপ্রবেশ। এই সমাজ আমাদের মনে সফল লোকদের একটি চিত্র এঁকে দিয়েছে। সেই চিত্র ধরে আমরা এগিয়ে যাই। ইন্টারনেটে সার্চ দিলে লাখ লাখ লেখা, অ্যাপস, বই আর ওয়েবসাইট আসবে সফল হওয়ার রোডম্যাপ পন্থা বোঝাতে; কিন্তু হলফ করে বলতে পারি তাবৎ বই ঝাড়া মুখস্থ করে, তাবৎ অ্যাপস ডাউনলোড করে মস্তিষ্কে আপলোড করেও সত্যিকারের সফল হবেন না। আপনাকে সফল হতে হলে অনুধাবন করতে হবে সফলতা জিনিসটি কী।

এক মা তার সন্তানকে এইচএসসিতে ভালো জিপিএ না পাওয়ায় ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বলেছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে ছেলেটি দুঃখ-কষ্টে পরিবারের মানুষের খোঁচাখুঁচিতে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তা করেনি। আজ সে সরকারি মেডিক্যাল কলেজের পাস করা ডাক্তার। সেদিন সে ছিল পরিবারের কাছে ব্যর্থ। মেডিক্যাল ভর্তির পর থেকে পরিবার ও সমাজের নিকট হয়েছে সফল ব্যক্তি। তার মাকে বলতে শুনেছি যে, ‘আসলে তিনি সে সময় ছেলের ফলাফল নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন, ভেবেছিলেন তার ছেলে গোল্লায় গিয়েছে।’ ডাক্তার হওয়াতে ছেলে গোল্লায় যাননি বলে আমাদেরও ধারণা। ধরুন, তিনি ডাক্তার কিন্তু রোগী পান না কিংবা ঘরে ঘরে গিয়ে বিনা ‘ফি’-তে বা নামমাত্র ‘ফি’-তে রোগী দেখেন। তাই তিনি বাড়ি-গাড়ি কিছুই করতে পারেননি; তখন কি সেই ডাক্তারকে আমরা সফল বলি? নাকি আমার বলি, ‘কী ডাক্তারি পড়ল বাড়ি-গাড়ি কিছুই নেই, বটতলার ডাক্তার।’ সব পেশার ক্ষেত্রে এটি সত্য।

জীবনের নানাপর্যায়ে সফলতার রূপ একেক রকম। ভালো স্কুলে, তারপর ভালো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া তারপর ভালো চাকরি বা ব্যবসা করা। ভালো টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি করা এটাই তো এখন সফল ব্যক্তির সংজ্ঞা। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, বড় চাকরি, বিসিএস ক্যাডার বা বড় ব্যবসায়ী হলে আমরা অবলীলায় তাকে সফল বলছি; যারা এসব হননি তাদের বিফল বলি। তাদের বিফল বলার অধিকার কে দিয়েছে? সমাজে সফল মানুষের ধারণা এ রকম- তিনি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী, বিসিএস ক্যাডার বা বড় চাকরিজীবী হবেন, তিনি প্যান্ট-শার্ট ইন করা চকচকে জুতা পরিহিত ব্যক্তি হবেন, ফ্ল্যাট, বাড়ি ও গাড়ি থাকবে এবং অনেক লোকজন তাকে চিনবে ও ভয় পাবে (শ্রদ্ধা করতেও পারে, নাও পারে)।

আমাদের এই সফল মানুষ হওয়ার সংজ্ঞা থেকে ভালো মানুষ হওয়া ফিকে হয়ে আসছে। যেন অর্জনই মুখ্য, অর্জনের পদ্ধতি একেবারে গৌণ। তাই তো দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা, বার্ষিক পরীক্ষা, বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। আর এসবের ‘ক্রেতা’ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকও। সমাজ গুরুত্ব দিচ্ছে চোরাকারবারি, ঘুষখোর, চাঁদাবাজ, কালোবাজারি, মুনাফাখোর বা সম্পদবাজদের। সৎ কিন্তু দরিদ্র লোকের অধিকার নেই। এই যে অসুস্থতা, অসুস্থ সফলতা আর তা অর্জনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা এসব মানুষকে বিকারগ্রস্ত করে তুলেছে। তাই বোর্ড পরীক্ষায় ফেল করে আত্মহননের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে সম্পদের লড়াইয়ে খুনের ঘটনাও। চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো কখনো কি বলিনি- অমুকে ফ্ল্যাট কিনল, তুমি কী করলা? অমুকে ওই চাকরি করে, তুমি কী করলা? অমুক বুয়েটে, ডাক্তারি, আইবিএ বা বিসিএসে চান্স পেয়েছে; তুমি কী করলা?’ আমাদের এই চাওয়া বস্তুগত বা সম্পদগত অর্জনে, গুণগত নয়। আমাদের তুলনা বস্তুগত অর্জনের সাথে, মেধা ও গুণভিত্তিক অর্জনের সাথে নয়। তা সত্যিকারের সফল মানুষ তৈরি করে না। এই তুলনা ক্ষেত্রবিশেষে বিপথে সম্পদ অর্জনে সফল করে।

সফলতার প্রথম সূত্র ‘তুলনা না করা’। কখনোই অন্যের ধনসম্পদ, পেশা ও পড়ালেখার সাথে তুলনা নয়। নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রেও এ রকম করবেন না। যেটি করছেন সেটি সঠিকভাবে নিষ্ঠা ও সততার সাথে করুন। কে কোথায় পড়ে, কী করে, কী করেছে চিন্তা না করে আপনার কাজ করুন। তুলনা করা শুধু শিক্ষা বা কর্মজীবনেই নয়, পারিবারিক জীবনেও বিপদ ডেকে আনে। একটা উদাহরণ দিই- প্রায়ই স্ত্রীরা স্বামীদের বলে, ‘অমুক তোমার মতো একই চাকরি করে গাড়ি কিনেছে, বউকে গয়না দিয়েছে, তুমি এই জীবনে আমাকে কিছুই দিলে না।’ এভাবে স্ত্রী তার স্বামীর মনে ব্যর্থতার বেদনা উসকে দেন। এত দিন যে নির্ভেজাল ভালোবাসা স্বামী স্ত্রীকে দিয়েছেন তা ওই গয়না-গাড়ি না দেয়ার কারণে ‘কিছুই দিলে না হয়ে গেল’। ভালোবাসার চেয়ে সম্পদই মুখ্য হয়ে গেল। একই কথা স্বামীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

একইভাবে সন্তানদের আমরা বলি, ‘অমুক তো ওই স্কুল-কলেজে চান্স পেল। তুই তো পেলি না। তোদের জন্য সব করেছি। এখন কিভাবে মুখ দেখাব?’ ওই স্কুল থেকেই কি দেশের সব ভালো সফল মানুষ তৈরি হয়? সে প্রকৃতই কী শিখছে তার ওপর গুরুত্ব দিন। কার ছেলেমেয়ে কী পড়ছে, কই পড়ছে তার সাথে তুলনা করা বন্ধ করুন। দুইজন মানুষের সফলতার রাস্তা কিন্তু এক নয়। এই তুলনা করা বন্ধ করতে পারলেই সফলতার রাস্তায় পৌঁছে যাবেন। ‘তুলনা করা’ মানুষকে প্রায়ই বিপথে ঠেলে দেয়।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো- সফলতাকে শুধু বস্তুগত অর্জন দ্বারা পরিমাপ না করা। বড় চাকরি বা ব্যবসা, গচ্ছিত সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি দ্বারা সফলতাকে যাচাই করা সবচেয়ে বড় ভুল। অর্জনকে প্রাধান্য দেয়ার চেয়ে অর্জনের পদ্ধতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই কথা শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নকল করে গোল্ডেন জিপিএ পেলে লাভ কী? ফলাফল ওরিয়েন্টেড না হয়ে, জ্ঞান ওরিয়েন্টেড হতে হবে। মনে রাখতে হবে, GPA is nothing but a digit, but knowledge is eternity। রেজাল্ট সাময়িক আনন্দ বা সাফল্যের অস্থায়ী সুখ দিতে পারে; কিন্তু জ্ঞান সীমাহীন আনন্দ ও স্থায়ী সাফল্য দেবে। কথাটা যদি ছাত্রছাত্রী কিংবা অভিভাবকেরা উপলব্ধি করে, রেজাল্ট খারাপ হওয়ার কারণে কোনো দিন কেউ আত্মহত্যা করবে না। সার্টিফিকেটধারী হওয়ার চেয়ে সৎ গুণের অধিকারী হওয়া অনেক বেশি কল্যাণকর।

ঘুষ খাওয়া বড় সরকারি চাকরিজীবী, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ওষুধ কোম্পানির কমিশন খাওয়া বেরহম ডাক্তার, আদর্শ বিবর্জিত ধান্ধাবাজ নামী শিক্ষক, শ্রমিকের বেতন আর ব্যাংক ঋণের টাকা মেরে দেয়া ব্যবসায়ীদের কিংবা লোকচক্ষুর আড়ালে অবৈধ কারবার করে রাতারাতি ধনী হওয়া ছদ্মবেশীদের আল্লাহর ওয়াস্তে ‘সফল মানুষ’ বলবেন না। তারা ‘সফল চোর’।

তৃতীয় বিষয়টি হলো, সফলতাকে কোনো অবস্থাতেই অর্জন দ্বারা যাচাই না করা। মনে করুন, আপনার সন্তান অমুক স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি; তাই বলে সে কি ব্যর্থ? কাক্সিক্ষত চাকরি পাননি বলে কি আপনি বিফল? আর এসব পেলেই কি আপনি সফল? মনে করুন, ভালো স্কুল-কলেজে পড়ে ভালো চাকরি বা ব্যবসা করে সম্পদ গড়েছেন; কিন্তু আপনার দ্বারা মানুষের একবিন্দু কল্যাণও হয়নি। তাহলে এই অর্জনের কি কোনো মূল্য আছে?

চতুর্থত যা-ই করবেন সৎভাবে, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের সাথে বৈধ পথে করবেন। এতে যা-ই ফলাফল, সেটাই সাফল্য। সৎ পথে সৎভাবে কাজ করে যে ফল তা-ই সফল। নকল করে বা প্রশ্নপত্র পেয়ে গোল্ডেন জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থী সাময়িকভাবে বাহবা পেতে পারে; কিন্তু জীবন চলার পথে সে ‘ধরা খাবেই’। এটা শুধু শিক্ষাজীবনে নয়, কর্মজীবন, পারিবারিক জীবনেও সত্য। আপনি নিজে তো জানেন আপনি কী। কারো চাকচিক্য, বাহারি জীবনযাপন দেখে নিজেকে বা সৎ অর্জনকে তুচ্ছ ভাববেন না।
উপরি উক্ত সূত্রানুযায়ী আপনি ৫০ ভাগ সফল হয়ে গেছেন আর ৫০ ভাগ শুধু একটি কাজ করলে সমাপ্ত হবে। সেটি হলো, যা কিছু আপনার অর্জন তা সবার সাথে কিঞ্চিৎ হলেও ভাগ করে নেয়া; অর্থাৎ আপনার অর্জন মানব ও সৃষ্টির কল্যাণে ব্যবহার করা। প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিরা বিখ্যাত হয়েছেন শুধু মানুষ আর সৃষ্টির কল্যাণে আমৃত্যু সংগ্রাম করে, টাকা-পয়সা জমিয়ে নয়। পলান সরকার কিংবা ময়মনসিংহের রিকশাচালক ষাটোর্ধ্ব জয়নাল আবেদীনের কথা জানেন? সফল তো সেই ব্যক্তি, মৃত্যুর পর যার শূন্যতায় মানুষের মন কেঁদে উঠবে। চোখের কোণে অশ্রু জমে অজান্তে বলে উঠবে- ‘আহ, লোকটা বড় ভালো ছিলেন’। এটাই সাফল্য।

সত্যিকারের সফল মানুষেরা সুখী। সুখের জন্য প্রয়োজন একটি পরোপকারী, নির্লোভ নিঃস্বার্থ সৎ জীবন।

লেখক : সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার