‘ওকে একদম সহ্য করতে পারছি না’

সাদাত হোসাইন
আমি বিয়ে করেছি, কিন্তু কাউকে জানাই নি। না জানানোর অনেক কারণ ছিল। কারণগুলোও বলার মত ছিল না। তাই এই লুকোছাপা। সমস্যা হচ্ছে এখন জানাতে হচ্ছে। তবে এখন বিয়ের খবরের সাথে আরও একটি খবর জানাতে হচ্ছে, সেটি হচ্ছে ডিভোর্সের খবর। আমরা ডিভোর্স নিচ্ছি। মিউচুয়াল ডিভোর্স। কিন্তু তারপরও কিছু জটিলতা তৈরি হচ্ছে। সেই জটিলতাগুলো পাশ কাটাতে পারছি না। পারলে হয়তো ডিভোর্সের খবরটাও জানাতাম না।
– জটিলতাগুলো কী?
– আই অ্যাম প্রেগন্যান্ট।
– প্রেগন্যান্ট অবস্থায় কি ডিভোর্স হয়? মানে আমি জানি না, এই সংক্রান্ত কোন আইন আছে কি না?
– আমিও জানি না। এইজন্যই আপনাকে নক করা। আপনার পরিচিত কোন আইনজীবী আছে?
– ডিভোর্স কেন হচ্ছে?
– আমার কারণেই হচ্ছে। ওকে আমি সহ্য করতে পারছি না।
– বাহ! এই প্রথম শুনলাম, কেউ একজন তার নিজেকে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে। সবাই এই ধরণের ঘটনায় সবসময় অন্যজনকে দোষী হিসেবে দেখায়।
– নাহ। সমস্যাটা আমার। আই কান্ট টলারেট হিম। একটা ভুল করে ফেলেছিলাম। ইউনিভার্সিটিতে ঢুকেই দুম করে প্রেম। মাথা কাজ করছিল না। একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। ওকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল ওকে বিয়ে না করলে আমি বাঁচব না। মরে যাব। ও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। খুব ভয় হত। এইজন্য দুম করে বিয়ে করে ফেলেছি। ও চায় নি, তারপরও। জোর করেই করেছি বলা যায়।’
– এখন সে কি বলছে?
– ভাবতে বলছে, সময় নিতে বলছে, কান্নাকাটি করছে।
– তো আপনি ভাবতে চাইছেন না? সময় নিতে চাইছেন না?
– অনেক ভেবেছি। কিন্তু ভাবনা আগাচ্ছে না। আসলে আমার মাথা কাজ করছে না। আমি ওকে সহ্য করতে পারছি না। তাছাড়া আমার স্কলারশিপ হয়ে গেছে। আমাকে দেশের বাইরে যেতে হবে। আমার ক্যারিয়ার আছে।
– ওকে সহ্য করতে পারছেন না কত দিন?
– উমমমম… এগজ্যাক্ট বলতে পারব না। তবে অনেক দিন থেকেই শুরু হয়েছিল। লাস্ট কিছুদিন থেকে বাড়ছে। প্রচণ্ডরকম বাড়ছে।
– আপনার বাচ্চার কি হবে?
– এবরশন করাবো।
– সন্তানের জন্য মায়া হচ্ছে না?
– আমিতো জানিই না সন্তান কি! আরেকটা কথা মা হবার জন্য কিন্তু আমি প্রস্তুত ছিলাম না। ইট ওয়াজ অ্যান এক্সিডেন্ট। অ্যান্ড আপনি জানেন রোজ অসংখ্য এবরশন হচ্ছে।
– হু। তা ঠিক। বাট আপনি আরও খানিক সময় নিতে পারতেন।
– নাহ। আমি অনেক ভেবেছি। এই বিষয়টা আমি কাউকে জানাতেই চাই না। আমার ভাবনা বদলেছে। তখন বাচ্চা ছিলাম, হুট করে মাথায় যা এসেছে তাই করে ফেলেছিলাম। বিয়েটা করে ফেলেছিলাম। এখন বুঝতে পারি কতবড় ভুল করেছিলাম।
– তখন কী মনে হচ্ছিল, ঠিক করছেন?
– হু। তখন মনে হচ্ছিল, এর চেয়ে সত্যি, সঠিক আর কিছু নেই জগতে! অস্থির হয়ে উঠেছিলাম।
– এখন এসে মনে হচ্ছে ভুল করেছিলেন?’
– হু । মহাভুল। ইশ, যদি সেই সময়টায় গিয়ে শোধরাতে পারতাম!
– সময় এই সুযোগটা কাউকে দেয় না। তবে একবার করা ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার সুযোগ দেয়। সেই শিক্ষা আরেকবার ভুল না করতে শেখায়।
– আমি আর ভুল করতে চাই না।
– আপনার ধারনা, এখন যেটি করতে চলছেন, সেটি ঠিক করছেন?
– একদম। এর চেয়ে সঠিক আর কিছু নেই।
– কিন্তু আজ থেকে বছর পাঁচ পরে গিয়ে যদি আবার মনে হয় আজকের এই দিনটায় ভুল করেছিলেন? মহাভুল? তখন শোধরানোর উপায় কি?
– মনে হবে না।
– কি করে জানেন?
– আমি জানি।
– কি করে?
– আমার মন বলছে।
– মন কিন্তু বিয়ে করতেও বলেছিল!
– তখন এখনকার চেয়ে ছোট ছিলাম।
– আজ থেকে পাঁচ বছর পরের চেয়েও এখন আপনি ছোটই আছেন।
– আপনি কথা প্যাচাচ্ছেন। আমি জাস্ট লয়ারের সাথে কথা বলতে চাইছিলাম।
– আমিই লয়ার।
– তাহলে আমাকে পরামর্শ দিন।
– পরামর্শ হল, চুপচাপ ঘরে যান। গিয়ে আপনার মাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদুন। কোন কারণ না বলেই কাঁদুন। দেখুন আপনার মা কি করেন। তারপর চোখ বন্ধ করে আপনি আপনার ভেতরের শিশুটির সাথেও তাই করুন। কারণ সেও একদিন এমন করে আপনাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদবে। এবং আজ আপনার কান্না শুনে আপনার মা যা করছেন, আপনিও একদিন তাই করবেন। এবং আপনার মা আপনাকে জড়িয়ে ধরবার পর আপনার যেই অনুভূতি হচ্ছে, আপনার ভেতরের ওই ভ্রূণটি যখন এমন রক্তমাংসের আস্ত একটা মানুষ হবে, তখন তারও এমন লাগবে!
– কিন্তু আমি আমার হাজবেন্ডকে সহ্য করতে পারছি না।
– সে আপনাকে পারছে?
– হু। কিন্তু ও যা করছে, সবই অসহ্য লাগছে।
– তাহলে কিছুদিন ব্রেক নিন। সময় নিন। একদম চুপচাপ থাকুন।
– কিন্তু আমার স্কলারশিপ?
– স্কলারশিপ আছে থাকবে। কোথাও যাবে না। কিন্তু ধরুন এরপর আপনি যদি আর কখনো মা হতে না পারেন!
– কিন্তু আমি সবাইকে কিভাবে জানাব?
– বিয়ের খবর না জানিয়ে একসাথে একদম ডিভোর্সের খবর যেভাবে জানাতেন, সেভাবেই জানান। তবে আমার ধারনা, তারচেয়ে ভালভাবেই জানাতে পারবেন বলেই আমার বিশ্বাস।
– আপনি ঠিক বলছেনতো? আমার কেমন কনফিউজড লাগছে এখন!
– হুম আমি ঠিক বলছি। আরেকটা কথা, এতদ্রুত কনফিউজড হয়ে যাবেন না। এতে বিপদ।
– কেন? বিপদ কেন? আপনার কথায়তো আমার এতদিনকার ভাবনা খানিকটা হলেও বদলাচ্ছে।
– এতদ্রুত ভাবনা বদলালে বিপদ। দেখা যাবে কারো কথা শুনে, এইভাবনার উল্টো ভাবনাও আপনাকে দ্বিধাগ্রস্ত করে ফেলবে। তখন? হয়তো ওই দুম করে বিয়ে করার ভাবনা, আবার এই দুম করে ডিভোর্সের ভাবনা, এই সবই অমন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে হুটহাট, দুম করে সিদ্ধান্ত নেয়ার ফল।
– আমি তাহলে এখন কি করব? আমার মাথা কাজ করছে না।
– অপেক্ষা করুন। দিন দশেক। একদম চুপচাপ। মাথা কাজ করা অবধি। তারপর আপনার হাজবেন্ডকে ফোন দিয়ে বলুন বাসায় আসতে। যে যা ভাবে ভাবুক। সবাইকে জানান। তার হাতখানা শক্ত করে ধরুন। ভাবুন, এই জগতে সে-ই একমাত্র পুরুষ, যে আপনার সবটুকু গ্রহণ করে, জেনে, পেয়ে যাওয়ার পরও আপনিযখন তাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন, সে তখনও আপনার সাথে থাকতে চাইছে। আপনাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইছে না। অথচ সবাই কেবল সবকিছু পেয়ে চলে যেতে চায়।
– আমি পারব না।
– আপনি পারবেন।
– কেন পারব?
– কারণ আপনাকে বুঝতে হবে, সবাই কেবল ছুঁয়ে দিয়ে চলে যেতে চায়, শক্ত করে ধরে নিজের কাছে রেখে দিতে চায় কেবল কেউ কেউ। এরা সংখ্যায় বিরল। এক জীবনে এদের দেখা পাওয়া যায় খুব কম। একবার হারালে এরা হয়তো আর কখনোই ফিরে আসে না। কখনোই না।
– আমার ওকে চাই না।
– চান। খুব ভালো করেই চান। এই মুহূর্তে সেটি বুঝতে পারছেন না। আমরা জগতে বেশিরভাগ সময়ই নিজেদের বুঝতে পারি না। আমরা চলি ঘোরে। হুটহাট যা মনে হয় করে ফেলি। তারপর কেঁদে কেটে বেড়াই জনমভর।
– কিন্তু আপনি তো লয়ার না।
– কে বলল?
– আমি জানি।
– কিভাবে জানেন?
– আপনার এড্যুকেশন দেখে।
– লয়ার হওয়ার জন্য সবসময় এড্যুকেশন দরকার হয় না। যেটা দরকার হয়, সেটা হচ্ছে কমন্সেন্স আর সেন্সিবিলিটি। আইন কমন্সেন্সের বাইরের কিছু না।
– আমি তাহলে কি করব?
– আপনি এখন আপনার মাকে জড়িয়ে ধরে অকারণে কাঁদবেন। তারপর ঘুমাবেন। ঘুম থেকে উঠে রোজ গল্প করবেন।
– কার সাথে?
– যে আপনার সাথে আছে!
– তারপর?
– তারপর দেখবেন একদিন ও ওর বাবার কথা জানতে চাইছে। আপনি তখন তাকে ফিসফিস করে বলবেন, ওর বাবা আপনাকে কত ভালোবাসেন! আপনিও তাকে কত ভালোবাসেন!
– আমিতো তাকে ভালোবাসি না।
– ওর সাথে কিছুদিন তাকে নিয়ে কথা বলুন। আমার ধারনা নিজেকে নিজে মিথ্যে বলতে পারলেও, ওর সাথে মিথ্যে বলতে পারবেন না।
– আচ্ছা, আমি রাখি।
– আমাকে জানিয়েন কিন্তু…
.
.
.
.
– আছেন?
– হু।
– ওর একটা নাম রেখেছি আমরা।
– কি?
– সেতু।
– সেতু কেন?
– ও তো সেতুই।
– এক কাজ করুন।
– কি?
– নামটা বরং পদ্মা বহুমুখী সেতু রেখে দিন। যা ঝামেলাটাই না গেল! আর স্কলারশিপটা একদম বিশ্বব্যাংকের মতন আচরণ করা শুরু করেছিল। হা হা হা!
– ধুর! আপনি না…
– কী আমি?
– কেমন জানি! আচ্ছা, রাখি…
– আচ্ছা।