নতুন বাস্তবতায় ফিলিস্তিন

হয়তো আমাদের অনেকের মনে আছে, প্রায় এক বছর আগে ২০১৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে ১৪-০ ভোটে পাস হয়েছিল ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাব। প্রস্তাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের নিন্দা ও তিরস্কার জানানো হয়েছিল। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ভোটদানে বিরত থাকে। তখন এটি পাশ্চাত্যে একটি বড় খবর হয়ে উঠেছিল। কারণ, ওবামা প্রশাসন তার শাসনের শেষ সপ্তাহে এসে এ প্রস্তাবে ভেটো দিয়ে ইসরাইলকে জাতিসঙ্ঘের তিরস্কারের হাত থেকে বাঁচাতে অস্বীকার করে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম এই কূটনৈতিক পদক্ষেপের ব্যাখ্যায় প্রশ্ন তুলেছিল- এটি কি ২০১৪ সালে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক কর্মসূচিসংক্রান্ত চুক্তি নিয়ে ওবামার সাথে নেতানিয়াহুর বিরোধেরই কোনো পার্শ্বফল? কিংবা এটি কি ছিল ট্রাম্প প্রশাসনকে ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব নিরসনে একটি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়া? কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুসালেমে স্থানান্তরসহ ইসরাইলকে দেয়া ট্রাম্পের অপরিণামদর্শী নানা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে বাধার মুখে ফেলার একটি প্রয়াস? কিংবা চরমপন্থী ইসরাইলি নেতৃত্বের পক্ষে খোলাখুলি অংশ নেয়ার পথে কিছুটা হলেও বাধা সৃষ্টি করা? হতে পারে এর পেছনে ভিন্ন আরো অনেক কারণ ছিল। তবে নিরাপত্তা পরিষদের এই ১৪-০ ভোটে পাস হওয়া ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাবের একটি স্থায়ী গুরুত্ব অবশ্যই আছে ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মতৈক্য হিসেবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চললেও এই প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটুকু জানিয়ে দিয়েছে- বিশ্ববাসী ফিলিস্তিন ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের বিষয়টি ভুলে যায়নি। এটিও গুরুত্বপূর্ণ- এই প্রস্তাবে জাতিসঙ্ঘের নতুন মহাসচিবের প্রতি আহ্বান রাখা হয়েছে, এ প্রস্তাব বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে নিরাপত্তা পরিষদকে প্রতি তিন মাস পর পর অবগত করতে হবে। এ ধরনের পদক্ষেপের অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে, জাতিসঙ্ঘকে ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব নিরসনের বিষয়টিও জাতিসঙ্ঘের অ্যাজেন্ডায় থাকতে হবে। এ প্রস্তাব আরো গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ হচ্ছে, এটি প্রতীকী প্রস্তাব হলেও ইসরাইলি বসতি নীতির আওতায়ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি এলাকায় কোনো ধরনের পরিবর্তন সাধন প্রত্যাশিত নয়। এসব বিষয়ে চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঐকমত্যে আনতে এ প্রস্তাব আনার পেছনে ছিল সেনেগাল, মালয়েশিয়া ও ভেনিজুয়েলা।

কিন্তু ইসরাইল এ প্রস্তাবের সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করার মধ্য দিয়েই এই প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়া জানায়। কারণ, এ প্রস্তাব ছিল এর অবলম্বিত নীতির প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ। তা ছাড়া ইসরাইল সংক্ষুব্ধ ছিল আমেরিকার প্রতি উল্লিখিত প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো না দেয়ায়। তা ছাড়া ইসরাইলের উদ্বিগ্ন হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে- সিভিল সোসাইটি ক্রমবর্ধমান হারে ইসরাইলের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে চলেছে বিডিএস (বয়কট, ডিভেস্ট, সেঙ্কশন) ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে। এ প্রচারাভিযান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমেই অধিকতর জনসমর্থন সৃষ্টি করতে পেরেছেÑ বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়। আসলে ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাব কার্যত ফিলিস্তিনিদের আন্দোলন সংগ্রামকে অধিকতর যৌক্তিক ও ফিলিস্তিনকে বিশ্ববাসীর কাছে একঘরে করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। শুধু পশ্চিম তীর নয়, জেরুসালেমের অবৈধ ইসরাইলি দখল অবসানে তা ইতিবাচক হয়ে উঠতে পারে।

এ সময়টার কথা যদি ধরা যায়, তবে বলতেই হবে একমাত্র ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের কথা বাদ দিলে বলা যায় ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরাইল একঘরে হয়েই আছে। যাবতীয় আন্তর্জাতিক আইন তাদের বিপক্ষে। আজকে জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী সংজ্ঞায়িত করে ট্রাম্পের পাগলামি ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা প্রশ্নে আমেরিকার মুখোশ পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে গেছে। সুখের কথা ট্রাম্পের এ পাগলামির সাথে বিশ্বের আর কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠী নেই। বিশ্বে সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক জোট ইইউ জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে। রাশিয়া ও চীনও এর বিরুদ্ধে। চীন ইতোমধ্যেই পূর্ব জেরুসালেমকে রাজধানী করে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধপূর্ব সীমানা অনুযায়ী একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠার পক্ষে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি জানিয়েছে। দেশটি এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, জেরুসালেম প্রশ্নে চীন মুসলিম বিশ্বের উদ্বেগের বিষয়ে অবগত এবং জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব ও আন্তর্জাতিক ঐকমত্য অনুযায়ী জেরুসালেমের মর্যাদা নির্ধারণ সমর্থন করে।

২২টি আরব দেশের সংগঠন আরব লিগসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। অপর দিকে, ওআইসির সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে প্রত্যাহার করার পাশাপাশি পূর্ব-জেরুসালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেছে। এরপরও মধ্যপ্রাচ্যে মানবতার শত্রু হিসেবে আভির্ভূত হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দেশ যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনি ও ফিলিস্তিন এখন নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। তাই তাদের সামনে এখন নিজস্ব রাজনীতি, জোট ও জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের কৌশল প্রণয়ন ও অবলম্বনের চূড়ান্ত সময়। এ পর্যন্ত যেভাবে কর্মকাণ্ড চলেছে, ট্রাম্পের ঘোষণার পর আর সেভাবে চলা যাবে না। বাস্তবতা হচ্ছে- ট্রাম্পের এ ঘোষণা এসেছে এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মতৈক্যকে উপেক্ষা করে। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতিকে উপেক্ষা করে।

১৯৯৪ সালে সূচনার পর থেকে ফাতাহ মুভমেন্ট নিয়ন্ত্রণ করে আসছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। ফাতাহ মুভমেন্ট এরই মধ্যে ট্রম্পের এ সিদ্ধান্ত নেয়ার বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষোভের কথা জানিয়েছে। এরা ঘোষণা করে ‘ডে অব রেইজ’ তথা ‘দুর্বার ক্রোধ দিবস’। অধিকৃত ফিলিস্তিনে এ দিনে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। এতে বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি শহীদ হন। আহত হন আরো অনেকে। সহজবোধ্য কারণে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ছিল তাদের এ যৌক্তিক ক্ষোভ প্রকাশ।

এ কথা নিশ্চিত, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধিকার আদায়ের বিরুদ্ধে যেসব অন্যায় অপরাধ-অপকর্ম চালিয়ে আসছে, যেভাবে অধিকৃত ফিলিস্তিনে সামরিক নির্যাতন-নিপীড়ন জারি রেখেছে, সন্ত্রাসী ইসরালি বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে অব্যাহতভাবে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে, ফিলিস্তিনকে দখলে রাখায় সহায়তা করছে, ইহুদি বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণে প্রত্যক্ষ মদদ দিয়ে আসছে এবং সর্বশেষ ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি ঘোষণা করেছে- তাতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের তো বটেই, বিশ্বের বিবেকী মানুষের নিন্দা ও ক্ষোভের মুখে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণার পর ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকে আরো জোরালো লড়াইয়ে নামতে হবে বৈকি। ট্রাম্পের এ ঘোষণার পর ২৫ বছর ধরে চলা তথাকথিত শান্তিপ্রক্রিয়া অচল হয়ে গেছে। এ প্রক্রিয়ায় ‘দুই রাষ্ট্রতত্ত্ব’ এখন আরো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে ট্রাম্পের পাগলামির কারণে। তথাকথিত এ শান্তিপ্রক্রিয়া থেকে ফিলিস্তিন কিভাবে ও কখন বেরিয়ে আসতে পারবে, এখন সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আজ অভিযোগ উঠেছে, ফিলিস্তিনি নেতারা ভুল সড়কে হাঁটার কারণে ২৫ বছর ধরে শান্তিপ্রক্রিয়াকে ইহুদিদের কব্জা থেকে বের করে এনে ফিলিস্তিনকে ইসরাইলের দখল থেকে মুক্ত করতে ও স্বাধীন ফিলিস্তিন কায়েম করতে পারেননি। এমন অভিযোগও আছে, ফিলিস্তিনিদের কাছে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের লোক দেখানো শান্তিপ্রক্রিয়ার সমাধানে যারা বাধা দিয়েছেন, তাদের হয়রানি করা হয়েছে, কারাগারে পাঠানো হয়েছে কিংবা কঠোর শাস্তি দেয়া হয়েছে। এমনটি শুধু গাজায় নয়, পশ্চিম তীরেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, শিল্পী ও সক্রিয়বাদী যারা এ সিকি শতাব্দীর তথাকথিত শান্তিপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তারা নিগৃহীত হয়েছেন। আজ ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিতর্কিত ঘোষণা এটাই প্রমাণ করে- শান্তিপ্রক্রিয়ার নামে যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো পাতানো ফাঁদে ফিলিস্তিনিদের মুক্তি আসবে না। জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা দেয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র বলছে- ফিলিস্তিনকে এ বাস্তবতা মেনে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। আর দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। এখন বিশ্ব জনমতের চাপে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন এ কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরপরই ট্রাম্পের মুখ থেকেই আমরা শুনেছি- ‘টু স্টেট থিওরি ইজ ওভার’। তা ছাড়া, নির্বাচনের আগে তিনি এ-ও বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে তিনি ইরানের সাথে ওবামা প্রশাসনের করা পারমাণবিক চুক্তি ছিঁড়ে ফেলে দেবেন। এখন তিনি সে প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছেন। এখন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি কাজ করবেন বলে যে শান্তির ললিতবাণী বিশ্ববাসীকে শোনাচ্ছেন, তা বিশ্বাস করা আর বোকার স্বর্গে বাস করা একই কথা।

অপর দিকে, নেতানিয়াহু বলছেন- জেরুসালেম ইসরাইলের রাজধানী হলেও এই নগরীতে সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষা করা হবে। এটি নেতানিয়াহুর আরেক ভণ্ডামি। এটি যে ইসরাইলের নতুন ভাঁওতাবাজি, তা ইতোমধ্যে প্রমাণ হয়ে গেছে। গত জুমাবারে তারা আল-আকসা মসজিদে মুসলমানদের নামাজ পড়তে দেয়নি। মুসল্লিরা মসজিদের বাইরে নামাজ আদায় করলে সেখানে ইসরাইলি সেনারা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে বহু মুসল্লিকে আহত করে। ইসরাইলের জাতীয় দৈনিক হারেতজসহ বিশ্বের গণমাধ্যমে এর সচিত্র প্রতিবেদন এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এর ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে আল-আকসায় নামাজ পড়তে মুসলমানদের ইসরাইলি সেনারা নানাভাবে হেনস্তা করেছে- এমন খবর বিশ্ববাসীর অজানা নয়। অতএব জেরুসালেম ইসরাইলের রাজধানী করা হলে এ পরিস্থিতির যে অভাবনীয় অবনতি ঘটবে, তা এখনই নিশ্চিত বলে দেয়া যায়।

বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে জেরুসালেম ও ফিলিস্তিন সমস্যা প্রশ্নে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এক পক্ষে, আর বাকি দুনিয়া এর বিপরীতে অবস্থান নিলেও ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণা প্রত্যাহারে আহ্বান-উপরোধ-অনুরোধ কোনো কাজেই আসবে না। তাই ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায় করতে আরব দুনিয়াসহ মুসলিম বিশ্বকে সুদৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ করে এ প্রশ্নে একটি সুনির্দিষ্ট একক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। একই সাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কূটনৈতিক কায়দায় এমন অবস্থানে আনতে হবে, যাতে এরা শুধু কথা দিয়ে সমর্থন না জানিয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি কার্যকর সক্রিয় সমর্থন দেয়। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। জাতিসঙ্ঘে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে কোনো পদক্ষেপ আটকে গেলে নিরাপত্তা পরিষদের অন্য সদস্যদেশগুলাকে বলতে হবে এবং জাতিসঙ্ঘ কাঠামোর বাইরে এসে ইসরাইলের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টির করতে হবে। সেটি কিভাবে করা যায়, তার উপায় উদ্ভাবন করতে হবে মুসলিম বিশ্বের নেতাদেরকেই। এটি তাদের ঈমানি দায়িত্বও বটে। ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকার চিন্তা সে পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। তাদের বুঝাতে হবে, শুধু কথার কথা দিয়ে ইসরাইলকে পথে আনা যাবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের অধিকার আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে মুসলিম বিশ্বের অনৈক্য প্রধানত দায়ী। তাই বর্তমান বাস্তবতায় সবার আগে প্রয়োজন মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া। মুসলিম দেশগুলোর অনৈক্যের সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল চক্র বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোকে একের পর এক ছিন্নভিন্ন করে চলেছে, ঠিক যেমনটি এরা চাইছে। আর এ ক্ষেত্রে অনেক মুসলিম দেশ তাদের হাতের পুতুল হয়ে খেলছে আবার কেউ ক্ষমতা হারানোর ভয়ে এ পথে হাঁটছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। জেরুসালেম কিংবা ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার হবে না। স্বাধীন ফিলিস্তিনের স্বপ্নও অপূর্ণ থেকে যাবে। মুসলিম অনৈক্যের অবধারিত পরিণাম আজকের আরব বিশ্ব- বিশেষত ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ আরো অনেক মুসলিম দেশ। এবার নতুন ষড়যন্ত্র হচ্ছে ইরানকে ইরাক বানানোর নতুন খেলা। এখানেও অনেক মুসলিম দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হাতের পুতুল হয়ে কাজ করছে। এদের পরিণতি কী হবে তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। নতুন বাস্তবতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলে মুসলিম উম্মাহর জন্য অপেক্ষা করছে নিশ্চিত বিপর্যয়।