সুধীর কাণ্ডে বাংলাদেশির রক্তে হাত রাঙাতে চায় আরএসএস!

বাংলাদেশের সঙ্গে ম্যাচ হেরে লজ্জায় নাক কেটেছে ভারতের। এর প্রতিশোধ না নিলে যেন বৃথা যাবে বেঁচে থাকা। আর তাই সুধীরকে টোপ বানিয়ে ভারতীয়দের ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করছে দেশটির কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠন রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ (আরএসএস)। ছড়াচ্ছে ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িকতার বীজ। অথচ সুধীর গৌতমের ওপর সত্যিই হামলা হয়েছে কিনা সেটা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে। সুধীর নিজেও বাংলাদেশের মিডিয়াকে বলেছেন, তার ওপর কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি।

অথচ সংগঠনটির ফেসবুক পেইজ (জ.ঝ.ঝ – রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ) থেকে একের পর এক পোস্ট দিয়ে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। উস্কে দেয়া হচ্ছে ভারতীয় এবং কলকাতার বাঙালিদের। পেইজটি থেকে বেশ কিছু দাবি জানানো হচ্ছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, বাংলাদেশে ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক ম্যাচ বাতিল, আইপিলে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে খেলতে না দেয়া এমনকি বাংলাদেশিকে দেখামাত্র মেরে ফেলার হুমকিও দেয়া হচ্ছে পেইজটি থেকে। এই পেইজ থেকে নিয়মিত আরএসএস’এর বিভিন্ন কার্যক্রম ও ছবি শেয়ার করা হয়। পেইজটির লাইক রয়েছে ৩৫ হাজার। তবে পেইজটি ভেরিফাইড নয়। এরপরও এধরনের পেইজ থেকে খেলার মত বিষয় নিযে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কি ধরনের অপপ্রচার চলছে তা পাঠকদের জানাতেই এটি প্রকাশ করা হল।

পেইজটি থেকে দেয়া একটি পোস্টে বলা হয়, সুধীরের ওপর হামলার প্রতিশোধ না নেয়া পর্যন্ত আমরা শান্তি পাবো না। আমাদের হাত যখন বাঙ্গালির রঙে রঞ্জিত হবে তখনই আমরা থামবো।

৫পেইজটি থেকে বিদ্বেষমূলক প্রচারে প্রথমেই মানবিক দিক থেকে আঘাত করা হয়। সুধীরকে নিয়ে প্রথম পোস্টে একটি ছবি পোস্ট করে লেখা হয়, ‘হত দরিদ্র পরিবারের সন্তান সুধীর। সাইকেল চালিয়েই বিহার থেকে বাংলাদেশ গিয়েছিলেন খেলা দেখতে এই ক্রিকেট পাগল মানুষটি। তার সাইকেলের একপাশে ছিল ভারতের পতাকা অন্য পাশে ছিল বাংলাদেশের পতাকা। এই নিরীহ ভাল মানুষটিকে মারার সময় কি একবারের জন্যও বাংলাদেশি যবনদের হাত কাঁপেনি? যে মানুষটা ভালবেসে বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়েছিল সাইকেলে তার হাত থেকে ভারতের জাতীয় পতাকা কেড়ে নিয়ে পতাকাকে অসন্মান জানানোর আগে একবারের জন্য হাত কাঁপলো না ঐ ঘৃণ্য পশুদের? ছিঃ বাংলাদেশ ছিঃ।’

সোমবার ৭.৩৫ মিনিটে দেয়া স্ট্যাটাসে বাংলাদেশকে কাংলাদেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, ‘সুধীর গৌতমের ওপর হামলা করে বাংলাদেশিরা শুধুই ঐ দেহটাকে আঘাত করেনি, আঘাত করেছে ১৩০ কোটি ভারতীয়র হৃদয়ে-তেরঙ্গাকে। বাংলাদেশিদের পাপের সাজা আমরা দেব। ইউ টিউবে সুধীর দার কান্না দেখে চোখে জল ধরে রাখা দায়! বাংলাদেশি বেজন্মারা তোরা রাষ্ট্রীয়ভাবেই বেজন্মা (বাঘের সাথেৃ)।’

সুধীর গৌতমের ওপর যেখানে হামলা হয়েছে কিনা সেটা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে সেখানে পেইজটি থেকে ফাদা হয়েছে এক মিথ্যে গল্প। তার ওপর আক্রমণের স্ট্যাটাসটি ছিল এমন, ‘কাল প্রকাশ পেল বাংলাদেশের আরব যবনদের আসল চেহারা। খেলা শেষ হওয়ার পর যখন সুধীর স্টেডিয়াম থেকে বেরোবে তখনই কিছু কাঙাল কুলাঙ্গার সুধীরকে অকারণে ধাক্কা মারতে মারতে তার হাতের তেরঙ্গা নিয়ে অপমানিত মন্তব্য করতে করতে তাকে স্টেডিয়াম থেকে বের করে দেয়। এর পর যখন সে বাইরে বের হয় তখন তাকে কয়েকটি জানোয়ার তাকে বাঁশ নিয়ে ধাওয়া করে এবং আঘাত করে। এর পর যখন সে দৌড়ে সামনে একজন পুলিশ দেখতে পায় তার কাছে যায়। পুলিশটি তাকে কোনো নিরাপত্তা না দিয়েই তাকে একটি অটোতে উঠিয়ে দেয়। এর পর আরও কিছু কুলাঙ্গার অটোতে বাঁশ নিয়ে আক্রমণ করে এবং অটোর ওপরের অনেক অংশ ছিঁড়ে যায় এবং সুধীর আহত হয়।’

একই স্ট্যাটাসে বাংলাদেশিদের নিশ্চিহ্ন করা এবং দেখা মাত্র হত্যার ডাক দেয়া হয় পেইজটি থেকে। ‘ভগবানের শপথ নিয়ে বলছি সুধীরের এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়া হবে। ২০১৬ টি-২০ বিশ্বকাপ ভারতে হবে এটা মনে রাখিস। আমরা ভারতীয় কাউকে প্রথমে আক্রমণ করি না কিন্তু অন্য কেউ আমাদের সাথে এই ভুলটি করলে তাকে নিঃশ্চিহ্ন করে দেই। ২০১৬ তে ভারতে তোদের বাঙলাদেশি প্লেয়ার পা রাখার সাথে সাথেই শেষ করে দেওয়া হবে।’১

২আরো লেখা হয়, ‘হে পশ্চিমবঙ্গবাসী দেখো বাঙালদেশকে। আপনারা যেখানেই কোন বাঙলাদেশি দেখতে পাবেন সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করুন। ভারত মাতার অপমান আর সহ্য হচ্ছে না। অনেক বাঙলাদেশি প্রতিদিন কোলকাতা আসে চিকিৎসা করতে। সব নার্সিং হোমের ডাক্তারদের প্রতি আহ্বানÑ আপনারা যদি ভারতকে ভালবাসেন তবে একটা বাঙলাদেশি জারজ রোগী যেন বেঁচে ফিরতে না পারে। বিএসএফ এর প্রতি আহ্বানÑ কদিন আগে যেমন একটা বাঙালদেশি গরু চোরকে গলা কেটে মেরেছিলেন সীমান্তে ঠিক এই মূহূর্ত থেকে আরও নৃশংস হয়ে উঠুন। একটা বাঙলাদেশি যেন বাচতে না পারে। আজ আর কোন সাধুতা দেখাচ্ছি না। ভারত মাতার অপমানে সব বাঁধ ভেঙে গেছে। ডাইরেক্ট বাংলাদেশি হত্যার ডাক দিচ্ছি। সবাই রেডি তো ভারতবাসী? জয়শ্রীরাম হিন্দু রাষ্ট্র ভারত মাতা কি-জয়।’৩

পেইজটি থেকে কেবল বাংলাদেশিদের সরাসরি হত্যার হুমকি দিয়েই থামছে না আরো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কঠোর ভাষায় গালি গালাজও করা হচ্ছে। মিয়ানমারে আটক বাংলাদেশি নায়েক রাজ্জাকের ছবি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, বাংলাদেশি পাপের সাজা দিচ্ছে মিয়ানমার। দেশ ভাগ নিয়েও করা হচ্ছে কটূক্তি।
মঙ্গলবার বিকেলে পেইজটির একটি স্ট্যাটাসে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ম্যাচ বাতিলের দাবি করে বলা হয়, ‘২০০৯ সালে পাকিস্তানে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটারদের আক্রমণ করা হয়েছিল বলে সেখানে আন্তর্জাতিক ম্যাচ বাতিল করা হয়েছে। ঢাকায় বাংলাদেশি ক্রিকেট সমর্থককে আক্রমণ করার প্রতিবাদে বাংলাদেশেও সব ধরনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ বাতিল করা হোক।’

উল্লেখিত পেইজটি ছাড়াও আরো অসংখ্য পেইজ ও ফেসবুক আইডি থেকে ছড়ানো হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিভিন্ন কথা। দেয়া হচ্ছে হুমকি।

উল্লেখ্য, আরএসএস ভারতের কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠন। ইতোপূর্বে ভারতের ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়েছে এর নেতারা। ভারতে মসজিদ গির্জা ভেঙে দেয়ারও হুমকি দিয়েছে এবং ভারতকে একমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র করার স্বপ্নদ্রষ্টাও এ সংগঠন। সংগঠনটির ফেসবুক পেইজ থেকে এমন কঠোর হুমকি, বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক বার্তা ছড়ানো ভয়ঙ্কর আতঙ্কের। এখনই সতর্ক না হলে বড় কিছু ঘটে যেতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই যায়। এসব বক্তব্যে বাংলাদেশকে তারা লেখছে কাঙালদেশ।